আমরাও ঘুষ খেতে চাই!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইতি
মাননীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব,
মহাশয়, সাধারণ ডাল-ভাতের বাজারে আগুন লাগিলে আমাদের বুক কাঁপে। কিন্তু এদেশের ঘুষের বাজারে যে প্রকার রাজকীয় জোয়ার, তাহা দেখিয়া আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষের নয়ন যুগল সার্থক হইল। টিআইবি খানা জরিপের নামে দেশের এক মহত্তম শিল্পকে হাটে হাঁড়ি ভাঙিয়া জনসমক্ষে আনিয়াছে। প্রতি একশতজন সরকারি রাজকর্মচারীর মধ্যে একানব্বইজনই নাকি উপরি নামক সুধা পান করেন! বাকি নয়জন বোধ হয় সদ্য এই পুণ্যভূমিতে পা রাখিয়াছেন অথবা কোন চিপা দিয়া কামাই করিতে হয়, তাহা এখনো শিখিয়া উঠিতে পারেন নাই। বড়ই চমৎকার এই পরিসংখ্যান। রাজসেবকদের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে আপনার সচিবালয়ের অলিন্দে অলিন্দে নিশ্চয়ই আনন্দের হিল্লোল বহিয়া যাইতেছে?
তবে দেশের রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিদের দীন দশা দেখিয়া আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয়ে বড়ই বেদনা জাগিয়াছে। তাহারা মাত্র উনিশ শতাংশ ভোট পাইয়া টেবিলের নিচে হাত গলানোর প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থানে রহিয়াছেন। একানব্বই বনাম উনিশ! এমন অসম ও করুণ ট্র্যাজেডি দেখিয়া কোন সহৃদয় ব্যক্তির অশ্রু সংবরণ করা সম্ভব? তাহারা তো রাজার লোক, সেবকদের হরিলুটের কাছে তাহারা হারিয়া যাইবেন, ইহা ভাবিলে লজ্জিত হইতে হয়।
টিআইবি খানা জরিপের নামে দেশের এক মহত্তম শিল্পকে হাটে হাঁড়ি ভাঙিয়া জনসমক্ষে আনিয়াছে
সামান্য দালাল কিংবা নিরাপত্তা প্রহরীরাও এই মহোৎসবে আপন আপন কুলা ভরিয়া লইতেছেন। চোর-পুলিশ-দারোগা সকলে মিলিয়া বেশ একটি আনন্দমেলা বসিয়াছে। দেশের বিরানব্বই শতাংশ মানুষ পকেট খালি করিয়া এই ঘুষ প্রদান করেন। ঘুষ না দিলে নাকি ফাইল নড়ে না, টেবিলের ওপর জড়ো হওয়া জড়বস্তুগুলোতেও প্রাণ সঞ্চার হয় না। আবার চরম দায়িত্ব অবহেলার কারণে ৫০ শতাংশ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা হইতে বঞ্চিত হন। কী অপূর্ব! একদিকে অকর্মণ্যের মতো বসিয়া থাকিবার বাহাদুরি, অন্যদিকে সেই জড়ত্ব ভাঙাইবার জন্য প্রণামি আদায়ের অনিন্দ্য কৌশল।
সচিব মহাশয়, আমাদের মতো উপরিহীন শ্রমজীবীর জীবন তো বড়ই একঘেয়ে, ধূলিমলিন। মাস শেষে খাঁটি ঘামটুকু ছাড়া আর কিছুই আমাদের ঝুলিতে জমা হয় না। সরকারি মসনদে বসিলে যদি এমন পারিজাত পুষ্পের ন্যায় উপরি ভাগ্যের দুয়ার খুলিয়া যায়, তবে আমাদের কেন এই আজীবন নির্বাসন? আমাদিগকে অন্তত নিয়তির নিকট হইতে ঘুষ আদায়ের একটা হিল্লে করিয়া দেন, যেটাকে আমরা নগদে রূপান্তর করিতে পারিব। আর সেই নগদ থেকেই না ঘুষও দিতে সক্ষম হইব। আমাদিগের এই আকুল আবেদনখানি দয়া করিয়া লাল ফিতার বাঁধন হইতে মুক্ত রাখিয়া বিবেচনা করিবেন।
ইতি
উপরিহীন এক শ্রমজীবী




