শুধু এআই দিয়ে চিড়ে ভিজবে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাঠ্যপুস্তক ছাপানোয় প্রেস মালিকদের সিন্ডিকেট ‘ওপেন সিক্রেট’। বছরের পর বছর চলে আসছে এই তুঘলকি কাণ্ড। প্রেস মালিক সিন্ডিকেট ও সরকারি কর্মকর্তাদের সখ্যে প্রাক্কলনের চেয়ে অস্বাভাবিক কম বা বেশি দরে কাজ বাগিয়ে নিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত কাগজের বই পৌঁছানো অধরাই থেকে েগছে।
সিন্ডিকেট দরপত্র ঠেকাতে এবার এআই প্রযুক্তির সাহায্য নিতে যাচ্ছে সরকার। সোমবার দৈনিক আগামীর সময় পত্রিকায় ‘বই ছাপায় ৬৯১ কোটি টাকা বাঁচাবে এআই’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দরপত্রে কারসাজি ধরতে প্রথমবারের মতো ব্যবহার হচ্ছে এআইনির্ভর ‘এসএলটি’, অর্থাৎ সিগনিফিক্যান্টলি লো-প্রাইসড টেন্ডার পদ্ধতি। এর মাধ্যমে অত্যধিক নিম্নমূল্যের দরপত্র শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মভিত্তিক সরকারি ক্রয় বা টেন্ডার প্রক্রিয়া ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্টে (ই-জিপি) শুধু সর্বনিম্ন দর দিলেই টেন্ডার পাস হবে না। এক্ষেত্রে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব না েপলে প্রেসের কালো তালিকাভুক্তি, এমনকি লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আগামী শিক্ষাবর্ষে বই ছাপায় সরকারের সাশ্রয় হবে অন্তত ৬৯১ কোিট টাকা।
এআই এখনো পুরোপুরি নির্ভুল নয় এবং এর স্বাধীন সক্ষমতার বিকাশ চলমান। ফলে এআইয়ের সাহায্যে সিন্ডিকেটের দরপত্র কতটা ঠেকানো যাবে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। এ ছাড়া প্রেস মালিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার ইতিহাস তো রয়েছেই। গত বছর এনসিটিবির শীর্ষ কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট তিনটি প্রেস মালিককে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও ছাপা হয়। এ বছরও এনসিটিবিতে এরকম কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে, ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হলে এআই দিয়ে ঠেকানো সম্ভব? এআই ‘এসএলটি’ প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এটি নির্ভুল কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। ফলে এনসিটিবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কোনো ফন্দিফিকির আঁটলে সেটি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। আমরা মনে করি, প্রথমত এনসিটিবির ভেতর দুর্নীতিবিরোধী ‘শুদ্ধি অভিযান’ পরিচালনা করা জরুরি। ঘরের শত্রু চিহ্নিত করতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে পালের গোদাদের খুঁজে বের করতে হবে। শুধু নতুন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে টেন্ডার জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট ঠেকানো যাবে না।
কয়েক বছর ধরে পাঠ্যবই যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বইয়ের কাগজ ও ছাপার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বই তৈরি থেকে বিতরণ পর্যন্ত কাজের বিভিন্ন ধাপে সমন্বয়েরও অভাব ছিল। ধরে নিলাম এআইয়ের সাহায্যে দরপত্রের সিন্ডিকেট ঠেকিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু নিম্নমানের কাগজ ও নিম্নমানের ছাপার মান ঠেকাতে এনসিটিবি কোন প্রযুক্তির সাহায্য নেবে?
এআই ‘এসএলটি’ প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আগামী শিক্ষাবর্ষে বই ছাপায় সরকারের ৬৯১ কোিট টাকা সাশ্রয় হবে। কিন্তু ব্যর্থ হলে পুরো টাকাটা কোথায় যাবে, কার পকেটে যাবে— সেটি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। প্রযুক্তি এসেছে, তাই বলে ভোজবাজির মতো সিন্ডিকেট উবে যাবে— এমন ভাবনা নিশ্চয় কাজের কথা নয়। প্রযুক্তিকে পরিচালনা করবে মানুষ, আর সেই মানুষ যদি অসৎ হয়, তাহলে প্রযুক্তি নেহাত পুতুলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তাই আগে ঘরের দিকেই তাকাতে হবে।




