বিদায় জাদুকর শিল্পী

মুস্তাফা মনোয়ার (জন্ম: ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৫; প্রয়াণ: ২৯ জুন, ২০২৬) । আঁকা: সোহানুর রহমান
বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার ৯০ বছর বয়সে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। তাকে হারিয়ে শোকাহত সাংস্কৃতিক অঙ্গন। গুণী এই শিল্পীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ
- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি।
- ১৯৬৭-৬৮ সালে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামের দুই পাপেট পশুর মুখ দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কটাক্ষ করতে থাকেন।
- ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ফজল-এ-খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ শিরোনামের গণসংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এটি গেয়েছিলেন ১০ জন শিল্পী।
- ১৯৭২ সালে বিটিভিতে শিশু প্রতিভা বিকাশের আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র রূপকার ছিলেন।
- ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট মিশুক (হরিণ শাবক) এবং ১৯৯৩ সালে ষষ্ঠ সাফ গেমসের মাস্কট অদম্য (বাঘরূপী পাপেট) নির্মাণ।
- বিটিভিতে ১৯৯৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ারের উপস্থাপনায় শুরু হয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। এতে পারুল, বাউল ভাই ও ষাঁড়ের কাণ্ডকারখানার পাশাপাশি ছবি আঁকা শেখানো হতো।
- দক্ষিণ এশিয়ার মেয়ে শিশুদের অধিকার রক্ষায় প্রভাববিস্তারকারী কার্টুন ‘মীনা’য় মুস্তাফা মনোয়ারের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল।
- শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত।
শিশুদের অনুষ্ঠান নির্মাণে পথিকৃৎ
মামুনুর রশীদ
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন আমাদের কাছে প্রিয় শিক্ষক। আমরা তার শিষ্যের মতোই ছিলাম। কীভাবে কাজ করতে হবে, ভাবতে হবে, দৃশ্য নির্মাণ করতে হবে; ধৈর্য নিয়ে সেসব বুঝিয়ে দিতেন। রঙ, নন্দনচেতনা, দৃশ্য বিন্যাস— এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল তার। তিনি সবকিছু মন দিয়ে শেখাতেন।
মুস্তাফা মনোয়ার টেলিভিশনের জন্য অসাধারণ সব কাজ করেছেন। বিশেষ করে শিশুদের অনুষ্ঠান নির্মাণে তিনি পথিকৃৎ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের জন্য মানসম্মত অনুষ্ঠান নির্মাণের ধারা মূলত তার হাত ধরেই শুরু হয়।
নাটকের ক্ষেত্রেও তার অবদান অনন্য। তখন ডিআইটির ছোট্ট একটি স্টুডিওতেই সব কাজ করতে হতো। সীমিত জায়গা, অল্প প্রযুক্তি নিয়েই তিনি স্টুডিওর ভেতর ও বারান্দা ব্যবহার করে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো অসাধারণ নাটক নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া প্রযোজনা করেছেন ‘রক্তকরবী’। আমার বিশ্বাস, তার এসব প্রযোজনা শতবর্ষ ধরে টিকে থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের টেলিভিশন কেমন হবে, কীভাবে অনুষ্ঠান নির্মাণ করা যাবে; এসব নিয়ে ভাবতেন। পরে দেশে ফিরে সেই ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তিনি যে কাজই করেছেন, সেখানেই নতুন কিছু প্রচেষ্টা ছিল। তিনি সবসময় নতুনভাবে ভাবতেন। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করার সাহস ছিল তার।
ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে তার সমকক্ষ খুব বেশি মানুষ ছিলেন বলে আমার মনে হয় না। তিনি নিঃসন্দেহে টেলিভিশনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজক ছিলেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার অবদান চিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সবকিছুই শিখিয়েছেন তিনি
কেরামত মওলা
মুস্তাফা মনোয়ারকে কয়েকটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। শুধু একজন চিত্রশিল্পী নয়; তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের কর্মী, শিল্প-সংগঠক, নাট্যনির্মাতা, টেলিভিশনের পথিকৃৎ এবং অসাধারণ একজন সৃজনশীল মানুষ। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পোস্টার আঁকতেন, আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন কাজ করতেন। বক্তৃতা দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তার আঁকা ছবি সবাইকে মুগ্ধ করত। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার, দেয়ালচিত্র— এসব কাজে নেতৃত্ব দিতেন তিনিই। আমরা কয়েকজন শুধু তাকে সহযোগিতা করতাম। আমি, আনোয়ার, শামসুল ইসলাম নান্টুসহ আরও অনেকে রঙ মিশিয়ে দিতাম, প্রয়োজনীয় কাজ করতাম। কিন্তু পুরো নকশা, পরিকল্পনা, বার্তা— সবই ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের।
তার হাতে যে কাজই যেত, সেটাই অসাধারণভাবে সম্পন্ন করতেন। দুঃখের বিষয়, এই দেশ তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারেনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই যুক্ত ছিলেন তিনি। তখন সেটি ছিল পাকিস্তান টেলিভিশন। সেই সময় প্রযুক্তি ছিল খুব সীমিত। আমরা হাতে লিখে অনুষ্ঠানের টাইটেল তৈরি করতাম। আমি নিজেও হাতে টাইটেল লিখতাম। কিন্তু কঠিন ছিল লাইভ অনুষ্ঠান পরিচালনা। সেটি পরিচালনা, ক্যামেরা ব্যবহারসহ অনুষ্ঠান কীভাবে সাজাতে হয়— সবকিছুই আমাকে শিখিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন, ‘এভাবে করো, ওভাবে করো।’ তিনি শুধু নিজে কাজ করতেন না, তার সঙ্গে যারা কাজ করত, তাদেরও তৈরি করতেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবে না।




