খুলছে জুলাই জাদুঘর, নিয়োগ হয়নি জনবল

ফাইল ছবি
নানা আলোচনা-সমালোচনা পেরিয়ে অবশেষে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটি উদ্বোধন করবেন বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর) দীপংকর বিশ্বাস। তিনি বলেছেন, ‘এই সময় দিয়েছেন সরকারপ্রধান। ওই দিন সকালে দুয়ার খোলার কথা রয়েছে। এর আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানাবে মন্ত্রণালয়।’
উদ্বোধনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত গ্রহণ করেননি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব। এতদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে এই পদে ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব।
দীপংকর বিশ্বাস জানালেন, বর্তমান মহাপরিচালকই আপাতত দায়িত্ব পালন করছেন। ৫ আগস্টের পর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেন নতুন মহাপরিচালক।
উদ্বোধন সামনে রেখে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, টিকিট ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। তবে স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় জাদুঘরের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্ন। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখানে কাজ করছেন জাতীয় জাদুঘরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত ৯ জুলাই জাদুঘর পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদও গঠন করা হয়। এর সভাপতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মহাপরিচালক সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোশফিকুর রহমান জোহান। পর্ষদের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখ আগামীর সময়কে জানালেন, জনবল নেওয়ার বিষয়টি পর্ষদের সভায় আলোচনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে নিয়োগ। আগের নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বললেন, জুলাইয়ের গান, প্রতিবাদী কবিতা ও নৃত্য পরিবেশন করা হবে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ১৭ দশমিক ৬৮ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত সাবেক গণভবনেই গড়ে উঠেছে এই জাদুঘর। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভবনটির দায়িত্ব নেয় সেনাবাহিনী। পরে ৫ সেপ্টেম্বর এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২৪ ডিসেম্বর নীতিগত অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।
জাদুঘর পর্ষদের সদস্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ আগামীর সময়কে বললেন, এটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। পর্যায়ক্রমে জনবল নিয়োগ হবে। এখন জাদুঘরটি চালু করাই গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের চেতনা কতটা প্রতিফলিত হয়েছে— এ প্রশ্নে তার জবাব, ‘যারা দেখবেন, তারাই বিচার করবেন।’
উদ্বোধনের আগেই জাদুঘরটি বিভিন্ন বিতর্কেরও জন্ম দেয়। নির্মাণ ও সংস্কারকাজ সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে মানদণ্ড থাকা উচিত, তা এই প্রক্রিয়ায় গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির নামে বিদ্যমান সরকারি ক্রয়নীতি ও বিধান এড়িয়ে যে প্রক্রিয়ায় কাজ দেওয়া হয়েছে, তা উসকে দিয়েছে অনিয়ম ও পক্ষপাতের আশঙ্কা।
জাদুঘরের নিয়োগ প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে। গত ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ৬ থেকে ২০ গ্রেডের ৬২টি পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ৯৬ জনকে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে সমালোচনার মুখে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। এ ছাড়া কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, ভাস্কর্য নির্মাণ, প্রামাণ্যচিত্র এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে মোট ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ এবং অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ফেরত গেছে সরকারি কোষাগারে। জাদুঘর পরিচালনার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের গুম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন তথ্য, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবন থেকে উদ্ধার করা নথিপত্র এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মারক সংরক্ষণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ওয়াকওয়ে, সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনা কক্ষ, প্রক্ষালন কক্ষ, টিকিট হাউজ, স্যুভেনির শপ, হেলিপ্যাডে ‘জুলাই মঞ্চ’ এবং প্রতীকী ‘আয়নাঘর’।




