৭০ টাকার পটোল দুদিন পর ১২০

সংগৃহীত ছবি
সকালের বাজারে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেও পটোলের দাম কম পেলেন না রাসেল মিয়া। শেষ পর্যন্ত এক কেজির বদলে আধা কেজি পটোল কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো তাকে। বেগুন, শিম, কাঁচা মরিচ— সবজির দাম শুনে প্রতিবারই করতে হচ্ছে নতুন হিসাব। মাছ কিনতে গেলে সেই হিসাব আরও কঠিন। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে কম বাজার করেই ফিরতে হচ্ছে অনেককে। রাজধানীর বাজারে শীতের আগাম সবজি উঠতে শুরু করলেও চড়া দামে স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। বরং মাত্র দুদিনের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে ভোগান্তি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাঁঠালবাগান, কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কাঁঠালবাগান বাজারে পটোল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০ টাকায়। অথচ গত বুধ ও বৃহস্পতিবারও এর দাম ছিল ৮০ টাকার আশপাশে। অর্থাৎ মাত্র দুদিনের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। মেরাদিয়া বাজারে লম্বা বেগুনের দাম উঠেছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। শিমের কেজি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা।
করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৫০, ঝিঙা ৮০ থেকে ১২০, বরবটি ৮০ থেকে ১২০ এবং ঢেঁড়স ৬০ থেকে ১০০ টাকায়।
কাঁচা মরিচের কেজি কোথাও ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, আবার কোথাও ২০০ টাকা পর্যন্ত। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। ফুলকপির দাম প্রতি পিস ৭০ থেকে ১৫০ টাকা। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে পেঁপে, কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। লাউ ৪০ থেকে ৮০ এবং মুলা বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৭০ টাকায়।
দাম শুনে অনেক ক্রেতাই কমিয়ে দিচ্ছেন কেনাকাটার পরিমাণ। কেউ এক কেজির বদলে কিনছেন আধা কেজি, কেউ আবার প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য নিয়েই ফিরছেন বাড়ি। বাজারে আসার আগে যে তালিকা তৈরি করেছিলেন, দোকানে এসে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
পটোলের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন রাসেল মিয়া নামে এক ক্রেতা। তিনি বলেছেন, ‘পটোল তো কালকেও ৭০-৮০ টাকা ছিল। আজ ১২০ টাকা চাচ্ছে। এটি কি হতে পারে?’
অন্য সবজির দাম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘কোনটার দাম কম বলেন? পেঁপে আগে ২০-২৫ টাকায় কিনলেও সেটি এখন ৩৫-৪০ টাকা। যে লাউ ৫০-৬০ টাকা ছিল, সেটি এখন ৮০ টাকার নিচে নেই। আমরা যাব কোথায়? কার কাছে বলব, দাম কমান?’
কারওয়ান বাজারের ক্রেতা মানিক মিয়ার কণ্ঠেও বাজারের বাড়তি খরচ নিয়ে হতাশা। তিনি বলেছেন, ‘দিন যতই যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। বাজারে সবজি, মাছ, মাংস— কোনটার দাম কম? সবগুলোর দাম বেশি। এক কেজি গরুর মাংস কিনতে গেলে আর কোনো টাকা থাকে না। আর বাজার করব কীভাবে?’
আরেক ক্রেতা সেলিম মিয়া বললেন, ‘আমাদের আর বলার কিছু নেই। কার কাছে বলবেন? কেউ তো আমাদের কথা শোনে না। আগে যা কিনতাম, এখন তার অর্ধেক কিনি। আর বুকে পাথর বেঁধে সবকিছু সহ্য করে যাই।’
দাম বাড়ার পেছনে পরিবহন ও সরবরাহের চাপ
বাজারে সবজির দাম বেশি থাকার কারণ হিসেবে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, বৃষ্টির প্রভাব ও সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা বলছেন বিক্রেতারা। তাদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে পণ্য পরিবহনের ব্যয়। পাশাপাশি পুরনো মৌসুমের সবজি কমে আসছে, কিন্তু নতুন শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে বাজারে দাম চড়া।
কাঁঠালবাগান বাজারের বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম জানালেন, বেগুন ১০০ টাকা কেজি এবং বাকি সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব বাজারে পড়েছে। এখন আগের সবজি শেষ হয়ে আসছে, আবার নতুন সবজিও পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে ওঠেনি। সব মিলিয়ে দাম কিছুটা বেশি।
আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। তবে সে সময় পর্যন্ত বাড়তি খরচ কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় ক্রেতারা।
মাছেও স্বস্তি নেই, স্থিতিশীল মুরগির দাম
সবজির পর মাছ কিনতে গিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। বাজারে রুই মাছের কেজি ৩৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য মাছের দামও চড়া বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
তবে মাংসের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৯০ টাকা, কক মুরগি ৩৩০ এবং লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮২০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা।
অন্যদিকে, কিছু বাজারে ডিমের দামে এসেছে সামান্য স্বস্তি। বিক্রেতাদের ভাষ্য, ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৪০ টাকায়, যা আগের তুলনায় ১০ টাকা কম। তবে সবজি ও মাছের বাড়তি দামের মধ্যে ডিমের এই সামান্য দরপতনেও সামগ্রিক বাজার খরচে বড় কোনো স্বস্তি ফিরছে না বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।



