হৃদয়ে ফিরছে ঢাকা

ভোরের আলো ফোটার আরও কিছুক্ষণ বাকি। সূর্যের সঙ্গে আড়ি দিয়ে মৎস্যকন্যারও সময় হয়েছে গভীর জলে ডুব দেওয়ার। জলরাশির ওপরে— ঊষার মৌনতায় আটকে আশপাশের প্রকৃতি। তবে সেই নীরব ছন্দে ছেদ ঘটে যখন গুরুগম্ভীর হুইসেল বাজাতে বাজাতে শান্ত বুড়িগঙ্গার জলধারাকে দুই ভাগ করে এগিয়ে আসে রাজধানীগামী লঞ্চগুলো। একে একে এসে সেই শব্দ বিলীন হয় সদরঘাটে নোঙর ফেলার মধ্য দিয়ে। এভাবেই সকাল শুরু হয় দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম নগর ঢাকায়।
নদীর বুক চিরে ছুটে চলা লঞ্চ, সদরঘাটে মানুষের ভিড়, রিকশার ঘণ্টি, কমলাপুরে ট্রেনের ঝকঝক শব্দ আর পুরান ঢাকার অলিগলিতে ভেসে আসা খাবারের ঘ্রাণ— সবই মনে করিয়ে দেয় এই শহরের শত শত বছর ধরে তৈরি হওয়া ঐতিহ্যকে। কোথাও পুরনো কোনো দালানের দেয়ালে জমে থাকা কয়েক শতকের ইতিহাস, আবার তারই পাশে কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কংক্রিটের নতুন ভবন। একই সঙ্গে পুরনো ও নতুন, প্রাণবন্ত এবং ক্লান্ত, বিশৃঙ্খল ও বিস্ময়কর এই শহরের নাম ঢাকা। বাংলাদেশের রাজধানী।
ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানীই নয়; একই সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কোটি মানুষের স্বপ্ন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু। সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১০ সালে ঢাকাকে করেন বাংলার রাজধানী। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে তখন শহরটির নাম রাখা হয় জাহাঙ্গীরনগর। এরপর সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে, শহরও বদলেছে; কিন্তু ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব কমেনি কখনো। মোগল আমলে বাংলার রাজধানী থেকে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বয়স পেরিয়েছে চার শতাব্দীর বেশি। তবে রাজধানী ঢাকার ইতিহাস শুধু ৪১৬ বছরের নয়। জনপদ হিসেবে এই অঞ্চলের ইতিহাস আরও বহু বছরের পুরনো। আর এই দীর্ঘ সময় ভাষা, সংস্কৃতি, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন— বহু ইতিহাসের সাক্ষী রাজধানী ঢাকা। দীর্ঘ এই পথচলার সাক্ষী হয়ে আজও ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে আছে লালবাগ কেল্লা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, আহসান মঞ্জিল, সদরঘাট, বিউটি বোর্ডিং, রোজ গার্ডেন, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনীয় গির্জা, বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবনসহ অসংখ্য স্থাপনা। স্থাপনার বাইরেও এই শহরের পরিচয় তৈরি হয়েছে তার মানুষ, খাবার, উৎসব, গান, ভাষা, আতিথেয়তা আর জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে। মসলিন, জামদানি, কাচ্চি, বাকরখানি, সাকরাইন, তাজিয়া, হালখাতা— সব মিলিয়েই ঢাকা। কিন্তু এত বছরেও দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বিস্তার আর জনসংখ্যার চাপে ঢাকার সঙ্গে আগায়নি এর নাগরিকদের সম্পর্ক।
সময়ের স্রোতে নাগরিকদের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়েছে ঢাকার। ফলে এই শহরে বসবাস করেন অথচ ঢাকাকে নিজের শহর মনে করেন— এমন অনুভূতি যেন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। যে শহর অন্ন জোগায়, বেঁচে থাকার পাথেয় জোগায় সেই শহরকে কেন আপন মনে করে না রাজধানীবাসী— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আয়োজন করেছে রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর উপলক্ষে ‘হৃদয়ে ঢাকা’ শীর্ষক উৎসবের। ডিএসসিসির লক্ষ্য শুধু একটি উৎসব আয়োজন নয়; বরং ইতিহাস-ঐতিহ্যের শহর ঢাকাকে নতুন করে চেনানো, নাগরিকদের সঙ্গে শহরের আবেগের সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা এবং ‘এই শহর আমার’— এমন একটি মালিকানাবোধ তৈরি।
দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘কোনো কিছুকে মানুষ যদি সত্যিই ভালোবাসে, তাহলে সেটিকে সুন্দর রাখতে চায়। নিজের ঘর যেমন মানুষ যত্ন করে পরিষ্কার রাখে, তেমনি শহরটাকেও যদি নিজের বলে মনে করে, তাহলে রাস্তায় ময়লা ফেলার আগে একবার ভাববে। ফুটপাত দখল করবে না, ঐতিহ্য ধ্বংস হতে দেবে না, শহরের প্রতি দায়িত্বশীল হবে।’
তার ভাষায়, অতীতকে পেছনে ফেলে ঢাকাকে নতুন করে জানাতেই এবার ‘হৃদয়ে ঢাকা’ উৎসবের আয়োজন করেছে সংস্থাটি। আগস্টের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া মাসব্যাপী এই আয়োজনের মধ্যে সাইকেল রেস, ম্যারাথন, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উৎসব, ঢাকার খাবার, বই, গান, চলচ্চিত্র, কাওয়ালিসহ নানা উদ্যোগের কথা জানালেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
নগর-পরিকল্পনাবিদরাও এমন উদ্যোগকে দেখছেন ইতিবাচকভাবেই। অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ঢাকাকে হৃদয়ে ফেরাতে সবচেয়ে আগে সেন্স অব বিলংগিং তৈরি করা জরুরি। নগরে বসবাস করার জন্য নাগরিক আচরণ তৈরি হওয়া দরকার। একই সঙ্গে দরকার নগরের কাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততাও।’







