৪৭-এর দেশভাগ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনির্মাণ প্রকল্প: অধ্যাপক মানস চৌধুরী

ছবি: আগামীর সময়
১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি রাষ্ট্রনির্মাণ প্রকল্প। এই বিভাজন সাধারণ মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক মানস চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নামে সমাজকে ধর্ম ও পরিচয়ের ভিত্তিতে এককেন্দ্রিক করার যে চেষ্টা হয়েছে, তা নাগরিকদের প্রতিনিয়ত আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলছে। এই সংকীর্ণ রাজনৈতিক দর্শনের বিকল্প দার্শনিক বোঝাপড়া তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
আজ শুক্রবার রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ‘বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ফিরে দেখা বাংলাভাগ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন অধ্যাপক মানস চৌধুরী। ‘বাংলাভাগ দিবস পালন পরিষদ’ এ সভার আয়োজন করে।
সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৪৭ সালের বাংলাভাগ শুধু মানচিত্র বা ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ ছিল না। এর ফলে কোটি মানুষের জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধন ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। রাজনৈতিক অভিলাষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া এই বিভাজনের ক্ষত ৭৯ বছর পরও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।
সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক মাহাথির মোহাম্মদ। তার ভাষ্য, দেশভাগের মূল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অভিজাত রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ও নারীদের।
জীবনানন্দ দাশ ও কবি আবুল হাসানের সাহিত্যের প্রসঙ্গ তুলে মাহাথির মোহাম্মদ উল্লেখ করেন, জমিনের ওপর কাঁটাতার বসানো গেলেও দুই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অভিন্ন আত্মিক যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ধারাবাহিকতায় তৈরি সাম্প্রদায়িকতা ও ট্রমা এখনো সমাজে সক্রিয়। এর বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের পারিবারিক স্মৃতি ও দেশভাগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ব্রিটিশদের বিভাজন নীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবিমৃশ্যকারিতায় লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।
দেশভাগের এই গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি তৎকালীন চিত্রকলায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ শাহ্ সূফী হাসান শাহ্ সুরেশ্বরী দিপুনুরী বলেছেন, ধর্ম মানুষের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না, মানুষের মূল পরিচয় তার মানবতায়। আধ্যাত্মবাদ মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে না, বরং সীমারেখা মুছে দেয়।
আয়োজক মোহাম্মদ আল মুন্তাজির বলেছেন, হাজার বছরের অভিন্ন ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালে কেন বাংলাকে বিভক্ত হতে হলো, সেই ঐতিহাসিক সত্য ও ক্ষতের নির্মোহ মূল্যায়ন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।







