সালাহউদ্দিন স্থানীয় সরকারে, স্বরাষ্ট্রে এ্যানি!

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে দল ও সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যের পদ থেকে এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন তিনি। শিগগির ছাড়ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্বও। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে শূন্য হবে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১। ফলে সেখানে হবে উপনির্বাচন।
সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন— দল ও সরকার-সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত। তার রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার পথ পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদ, মন্ত্রিসভার কয়েকটি দপ্তর, দলের স্থায়ী কমিটি এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসন— সবখানেই শুরু হয়েছে নতুন হিসাবনিকাশ।
বিএনপির নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন, সেটিই এখন দলের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেন। একই বৈঠকে নতুন মহাসচিব নিয়েও আলোচনা হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি।
দলীয় সূত্র বলছে, পরবর্তী কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকা, মামলা-হামলা ও কারাবরণ এবং দলের দুঃসময়ে দৃঢ় অবস্থানের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের পাশাপাশি পরবর্তী কাউন্সিলে তিনিই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়ার দৌড়েও এগিয়ে থাকতে পারেন।
মহাসচিব পদে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। দুজনই বর্তমানে সরকারের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন এই মন্ত্রণালয়ে আসতে পারেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এ বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শুধু মির্জা ফখরুলের দপ্তর বদলেই থামছে না মন্ত্রিসভার পরিবর্তনের আলোচনা। ১৭ আগস্ট তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ছয় মাসের কাজের অগ্রগতি, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই মূল্যায়নের পর মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিসরে রদবদল হতে পারে বলে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, অন্তত দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পরিবর্তন হতে পারেন। যেসব মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি তুলনামূলক কম, সেগুলোতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রীর হাতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে। কাজের গতি বাড়াতে তাদের কারও কারও দায়িত্ব কমিয়ে নতুন মুখ আনার কথাও ভাবা হচ্ছে।
সরকারসংশ্লিষ্ট একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এরই মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীকে ডেকে তাদের কাজের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কাউকে কাউকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার মতে, মাত্র ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে কাউকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তবে মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতির ভিত্তিতে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস বা মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করছে। প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সরকারের দুই মন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তত সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে। এসব মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও বলেছেন, মন্ত্রণালয়ে রদবদল সরকারের একটি স্বাভাবিক কার্যক্রম। এ নিয়ে মন্তব্যের সুযোগ নেই।
এদিকে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের সঙ্গে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদেরও নতুন করে যুক্ত করার আলোচনা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির অঙ্গীকার ছিল, সরকার গঠন করলে আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। বর্তমানে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
অন্য শরিকদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে। এক্ষেত্রে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে তাদের কাউকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থিতা বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতেও শূন্যতা তৈরি করেছে। ১৯ সদস্যের এই কমিটিতে তার পদটি শূন্য হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যু, পদত্যাগ ও সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব নেওয়ার কারণে আগে থেকে ছয়টি পদ খালি ছিল। ফলে এখন স্থায়ী কমিটির মোট সাতটি পদ শূন্য। দলের চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে পর্যায়ক্রমে এসব পদ পূরণ করতে পারবেন।
সবশেষে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে ঠাকুরগাঁও-১ আসন ঘিরে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সাংবিধানিক কারণে মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন কে পাচ্ছেন, তা নিয়ে এখনই শুরু হয়েছে জল্পনা।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই মির্জা পরিবারের প্রভাব রয়েছে। মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন সাবেক এমপি ও মন্ত্রী। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন সাবেক স্পিকার ও মন্ত্রী। ফলে উপনির্বাচনে পরিবার থেকে প্রার্থী আসার সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা বেশি।
এক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. মির্জা শামারুহের নাম আলোচনায় রয়েছে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও বাবার পক্ষে তাকে মাঠে সক্রিয় দেখা গেছে। পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সল আমীনও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জোরালোভাবে আলোচনায় আছেন।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ভবনে মির্জা ফখরুলের যাত্রা শুধু বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার পদ পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দলের নেতৃত্ব, স্থায়ী কমিটির সমীকরণ, সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক হিসাব। আগামী কয়েক সপ্তাহে এসব পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।






