সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে লাগাম
- তিন দিনের মধ্যে রপ্তানির তথ্য জানাতে নির্দেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিতে কঠোর হয়েছে সরকার। অনুমোদন দেওয়া রপ্তানি কোটা পুনর্বিবেচনা করে তা কমানো বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাই অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কী পরিমাণ সুগন্ধি চাল বিদেশে রপ্তানি করেছে, সে তথ্য আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই আদেশ জারি করেছে।
খুচরা বাজারে খোলা পোলাও বা সুগন্ধি চালের দাম কেজিপ্রতি ১৭০ এবং প্যাকেটজাত চাল ২২০ টাকায় ঠেকেছে। স্থানীয় বাজারে এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে রপ্তানিকে দায়ী করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন নতুন করে রপ্তানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত যুক্তি দিচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। উৎপাদন ও চাহিদার স্পষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরে তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিতিশীলতার জন্য রপ্তানি কোনোভাবেই দায়ী নয়; বরং অসাধু ব্যবসায়ীদের তৈরি কৃত্রিম সংকটই এর মূল কারণ। তাদের আশঙ্কা, প্রকৃত বাস্তবতা না বুঝে চাল রপ্তানিতে লাগাম টানলে বা তা বন্ধ করা হলে কৃষি খাত থেকে সরকারের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
দাম বৃদ্ধির এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাজারে চালের জোগান স্বাভাবিক রাখতে ও কৃত্রিম সংকট নিরসনে সুগন্ধি চালের রপ্তানি কোটায় কঠোর লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তাদের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী চাল বিদেশে পাঠাতে পারেনি। মূলত যেসব প্রতিষ্ঠান অনুমতি পাওয়ার পরও চাল রপ্তানি করেনি বা আংশিক করেছে, তাদের অব্যবহৃত কোটা বাতিল বা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
খাদ্য ও কৃষি খাতের তথ্যানুযায়ী, চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে রপ্তানি কিংবা উৎপাদন ঘাটতির যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবে একদমই টেকসই নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি মৌসুমে রেকর্ড ২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়েছে। বিপরীতে খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এই চালের বার্ষিক চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দেশে চালের জোগান রয়েছে পাঁচ গুণ বেশি।
বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইসহাকুল হোসাইন সুইট জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৪৫ হাজার টন চাল রপ্তানির অনুমোদন দিলেও, এখন পর্যন্ত হাজার টনেরও কম চাল বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। ফলে রপ্তানির কারণে চালের বাজারে টান পড়েছে— এমন দাবি সঠিক নয়। তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রথমে জুন মাসে রপ্তানির অনুমতি পেয়েছি। একটি চালান আমেরিকায় পৌঁছাতে সময় লাগে দুই মাস। ফলে এই অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি সম্ভব হয়নি।’
বাজার-বিশ্লেষক ও ক্রেতা সুরক্ষায় যুক্ত সংগঠনগুলো বলছে, সুগন্ধি চালের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সরকারি তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা যাচ্ছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এবং বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম খুরশিদ আলম মনে করেন, ছোট ছোট খুচরা দোকানে জরিমানা করে সুগন্ধি চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। সরকার যদি সত্যিই বাজার স্থিতিশীল করতে চায়, তবে যে বড় বড় আড়তদার ও মিল মালিক টন কে টন সুগন্ধি চাল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম অভাব তৈরি করেছেন, অবিলম্বে তাদের গুদামে অভিযান চালানো উচিত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৬৬৩ টন দিয়ে শুরু হওয়া সুগন্ধি চাল রপ্তানি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৮৭৯ টনে পৌঁছায়, যা থেকে আয় হয় ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। তবে পরবর্তী দুই অর্থবছরে আয় যথাক্রমে ২০ লাখ ৬০ হাজার ও ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে এলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার রপ্তানি স্থগিত করে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশে এ চাল যাচ্ছে।






