ভাস্কর্য ভাঙা ও রাজনীতির হাতুড়ি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০১৯ সালে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্মরণে রাজধানীর বুয়েটসংলগ্ন পলাশী গোলচত্বরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে নির্মাণ করা হয় আগ্রাসনবিরোধী ‘আট স্তম্ভ’। সেখানে সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, গণপ্রতিরক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, নদী, বন ও বন্দর রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদার কথা স্মরণ করানো হয়েছে। পলাশী চত্বর থেকে কয়েকশ গজ এগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ত্রিভুজাকৃতির একটি সড়কদ্বীপ। শ্বেতবর্ণের সারি সারি আবক্ষ ভাস্কর্য ঘিরে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’। অথচ এখন সেই চত্বরে ইতিহাস যেন নিজেই ক্ষতবিক্ষত। মুখ উল্টে মাটিতে পড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ও লালনের আবক্ষ ভাস্কর্য। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ লেখা তরুণের হাতের আঙুল উড়ে গেছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ জুড়ে ভাস্কর্য ভাঙার যে তাণ্ডব শুরু হয়, তা থেকে রেহাই পায়নি ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বরও। ভাস্কর শামীম সিকদারের গড়া এ চত্বরে রয়েছে ১১৬টি ভাস্কর্য। পরিসরের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য হিসেবেও পরিচিত। পলাশী চত্বরে আবরার ফাহাদের স্মরণে নির্মিত ‘আট স্তম্ভ’ যখন গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করাচ্ছে, তখন পাশেই ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যের এমন করুণ দশা অনেকের কাছে সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র হয়ে উঠেছে। রাজনীতি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন আগামীর সময়কে বললেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে— বেশিরভাগই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা ভাস্কর্য। কারা ভাস্কর্যগুলো ভেঙেছে, তার সাংস্কৃতিক রাজনীতির মধ্যেই বাংলাদেশের মতদর্শিক রাজনীতিটাও বোঝা যাবে। ২০০৮ সালে বিমানবন্দর চত্বরে ‘লালন ও বাউলদের ভাস্কর্য’ অপসারণের দাবিতে যারা সোচ্চার ছিলেন, তারা কিন্তু এখন জুলাই জাদুঘরে তৈরি হওয়া নতুন ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তি করছেন না। লালন ভাস্কর্য তৈরির সময় যে ইসলামি দলগুলো আমাদের নানা ধর্মীয় ব্যাখ্যা শুনিয়েছিল, তারা কিন্তু এখন নীরব। এই যে কোথাও সরব হচ্ছে আর কোথাও নীরব থাকছে— তার সাংস্কৃতিক রাজনীতিটা বোঝা জরুরি।”
‘কারা ভাস্কর্য ভাঙছে, তার সাংস্কৃতিক রাজনীতির মধ্যেই বাংলাদেশের মতাদর্শিক রাজনীতিটাও বোঝা যায়।’
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দিনাজপুরের তেভাগা চত্বরে থাকা সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা সিধু-কানুর ভাস্কর্যটিও আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। গতিশীল ঢাকার প্রতীক হিসেবে পরিচিত শিশু একাডেমির ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্যটিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকালে হামলা চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। চাকা নিয়ে দৌড়াতে থাকা শিশুর সেই ভাস্কর্য দুই বছর পরও সংস্কার হয়নি। গত মঙ্গলবার দোয়েল চত্বরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেল, দোয়েল পাখির ভাস্কর্যে রঙের কাজ চলছে। অথচ তার পাশেই শিশু একাডেমিতে ‘দুরন্ত’ যে স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েছিল, তার দুপাশে ঝুলছে নববর্ষের ব্যানার। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় একটি ভাস্কর্য ছিল। কাছে গেলে ভাঙা টুকরোগুলোই শুধু জানান দেয় তার অস্তিত্বের কথা। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্যটি ফেলে দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট। মেহেরপুরের ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’ও আক্রান্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। সেখানে পাঁচ শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকালে কমপ্লেক্সের তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। দুই বছরে কতটি ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, তার পরিসংখ্যান আছে কি না, জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির আগামীর সময়কে বললেন, ‘২০২৪ সালের ৫ অাগস্টের পর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসেই আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু ভাস্কর্য ভাঙচুরের পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছিলাম। সেটি আর পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি।’ তবে প্রথম আলো তাদের জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একটি তালিকা সংগ্রহ করে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে— মাত্র ১৪ দিনে দেড় হাজার ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়েছে। দুই বছরে সেই হিসাবটি আরও বেড়েছে। সম্প্রতি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যসহ আরও কয়েক জায়গায় ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ভাঙার পাশাপাশি গত দুই বছরে নতুন করে অনেক ভাস্কর্য নির্মিতও হয়েছে। এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি। সারা দেশে তৈরি হয়েছে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। গত ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। সেখানে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভাস্কর্য, ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে দমনপীড়ন নিয়ে ভাস্কর্য রয়েছে। রয়েছে জুলাইয়ে সাভারে নিহত ইয়ামীনের লাশ এপিসিতে করে ঘোরানোর আলোকচিত্রের আদলে তৈরি ভাস্কর্য, স্টাম্প কাঁধে আন্দোলনে বের হওয়া কিশোরীর ভাস্কর্য, জুলাইয়ে নারীদের অবদান নিয়ে ফোয়ারাবেষ্টিত ভাস্কর্য এবং লাশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের মিছিলের আলোকচিত্রের আদলে তৈরি ভাস্কর্য। এ ভাঙা ও গড়ার ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে— ভাস্কর্য কি শুধু শিল্প, নাকি তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক স্মৃতি ও মতাদর্শেরও বাহক? একদিকে নতুন স্মৃতিস্তম্ভ ও নতুন ভাস্কর্য নির্মিত হচ্ছে, অন্যদিকে পুরনো স্মৃতির ভাস্কর্য পড়ে আছে ভাঙা অবস্থায়। ফলে ভাস্কর্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন শুধু ভাঙা ও গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং কে কোন ইতিহাস স্মরণ করবে, কোন স্মৃতি দৃশ্যমান থাকবে আর কোন স্মৃতি মুছে যাবে— সেই প্রশ্নও ক্রমেই সামনে আসছে।
ফুলার
রোডের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে
চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর
মো. ইসরাফিল রতন আগামীর সময়কে
বললেন, “ভাস্কর্যটি সংস্কারের জন্য ভাস্কর্য বিভাগের
চেয়ারম্যান, বিশেষজ্ঞ ও চারুকলা অনুষদের
ডিনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন
করা হয়েছে। ভাস্কর্যটির শিল্পী শামীম সিকদার তো মারা গেছেন।
এজন্য তার উত্তরাধিকারীদের সম্মতি
ও স্বত্বাধিকারের কিছু ব্যাপার আছে।
তা ছাড়া ভাস্কর্যের মূল
আদল ও শিল্পমান অক্ষুণ্ণ
রেখে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ করার
কাজটি কিছুটা ‘স্পর্শকাতর’। একজন শিল্পীর
কাজ যখন আরেকজন করবেন,
সেটি নিয়েও তো প্রশ্ন উঠতে
পারে। এ ছাড়া বাজেটের
একটা বিষয়ও রয়েছে। বর্তমান বাজেটে এর জন্য আলাদা
বরাদ্দ না থাকায় স্পন্সর
বা অন্য কোনো উৎস
থেকে ফান্ড পাওয়া যায় কি না—
সেসব চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। কমিটি
এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে এবং দ্রুতই
এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
নেওয়া হবে।”






