যুক্তি অনুপস্থিত হলে ফ্যাসিবাদ ভর করে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সুদীর্ঘ পাঠান এবং মুঘল শাসনামলে ভারতবর্ষের কোথাও উগ্রসাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় হিন্দু ও মুসলিম সিপাহিরা দিল্লির বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ধূর্ত ব্রিটিশ ভারতবাসীর ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ বপন করে। কালক্রমে তারা সাম্প্রদায়িকতার মধ্য দিয়ে সাফল্য খুঁজতে থাকে। এখানে খুবই আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করা যায়, ইংল্যান্ড প্রত্যাগত কিছু উচ্চশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে এই বীজ বপন করা হয়। ভাবতে অবাক লাগে, উচ্চশিক্ষিত এসব তরুণের মধ্য থেকেই ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্ম হয়। হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় জাতীয়তাবাদী চিন্তার উন্মেষ ঘটায়। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেরণায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রেণি শোষণ এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য লড়াই করলেও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালে এসে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান ঘটে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাবাদ জনগণকে বিভক্ত করে ফেলে। উন্মত্ত এই বিষবাষ্প দুই ধর্মের মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে দাঙ্গায় বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায় এবং র্যাডক্লিফের দুর্বুদ্ধিতা দুটি দেশের সীমানা নির্ধারণ করে। একটা কৃত্রিম দেশবিভাগ উপমহাদেশের নেতৃত্বকে এক চিরন্তন শত্রুতায় নিয়ে যায়। অমীমাংসিত কাশ্মীর ইস্যু, ১২০০ মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তানের একটি অংশ, যা প্রথমে পূর্ব বাংলা এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান নামে চিহ্নিত হয়। পূর্ব বাংলার মানুষ প্রথমে উপলব্ধি করে এই তথাকথিত স্বাধীনতা আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর এক নতুন শোষণমূলক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। যার প্রকাশ ঘটে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনমূলক দাম্ভিক উচ্চারণ। প্রথমে এ লোকটি আঘাত করে ভাষার ওপর এবং পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির ওপর দমনমূলক নিপীড়ন চলতেই থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী সামরিক শাসন জারি করে দেশকে চিরদিনের জন্য এক স্বৈরাচারী একনায়ক রাষ্ট্রে পরিণত করে। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক সচেতনতা এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের পথে নিয়ে যায়। যেখানে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ওঠে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার কথা আসে; সবটা মিলিয়ে একটা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের লড়াই শুরু হয়। ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক লড়াই ছিল একাধারে মৌলিক এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সংযোগ সৃষ্টি করা। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন দেশের বিপ্লব এই আন্দোলনে যথার্থই পাশে এসে দাঁড়ায়। একটা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধের সময় দ্বিজাতি তত্ত্বের অনুসারীরা পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে। রাষ্ট্রদ্রোহী এ শক্তিটি পরাজয় মেনে না নিয়ে নানাভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থে পথ খুঁজতে থাকে। খুব শিগগির তারা পাকিস্তানিদের পথেই এক সামরিক রাষ্ট্র নির্মাণে সহযোগিতার মাধ্যমে মুক্তির প্রচেষ্টা চালায়। সুদূরপ্রসারী এ প্রচেষ্টার মধ্যে প্রধানত থাকে ধর্মীয় সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ধর্মের কল্যাণকামী অংশকে বাদ দিয়ে এক ধরনের ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা, ঘরে ঘরে পুরনো সেই সামন্তবাদী অবগুণ্ঠন এবং নারী স্বাধীনতায় ব্যাপক হস্তক্ষেপ করে। এসব সাংস্কৃতিক উপাদানের সঙ্গে তারা যুক্ত করে অর্থনীতিভিত্তিক কর্মকাণ্ড। দেশের বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক সময় রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হয়ে পড়ে। প্রগতির চাকা পেছন থেকে ঘুরতে শুরু করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিস্পৃহতা এবং যোগসাজশ তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়। এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু। তাই ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ক্রমাগতভাবে সমাজে একটা জায়গা করে নেয়। তার বিপরীতে বাঙালির আবহমানকালের সংস্কৃতির পথ ধরে জাতীয়তাবাদী চিন্তা পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি এসব অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রণোদনা দিতে গিয়ে কখনো পিছিয়ে পড়েনি। পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়ে মানুষের অসাম্প্রদায়িক চিন্তার একটা বাঁধভাঙা জোয়ার লক্ষ করা যায়। এই অপ্রতিরোধ্য চেতনা রমনার বটমূলের অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং দেশব্যাপী বৈশাখ উদযাপন জাতীয় সংস্কৃতির একটা মূল কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে গড়ে ওঠা বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সংগোপনে গৃহকোণগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যস্ততার ফলে এবং দুর্নীতিকে দমন করতে না পারায় গ্রামাঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হতে পারেনি। এসব শক্তি অত্যন্ত গোপনেই তাদের শাখা বিস্তার করে। যার ডালপালা একসময় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক কাজগুলো খুবই সুদূরপ্রসারী এবং নীরবে ঘটতে থাকে। এই নীরব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শাসকগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে। তাই যখন এই বিপুল শক্তি পথে নামে, তাকে প্রতিহত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু অন্যদিকে এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাসকে মৌলবাদীরা আঘাত করে ফেলে। যেমন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাজারগুলোতে আক্রমণ করে এক ধরনের মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা চালায়। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের ফ্যাসিবাদবিরোধী বলে প্রচার করলেও তারা এই আঘাতকে থামানোর কোনোরকম চেষ্টা করেনি। ফলে জনগণের কাছে তাদের বিশ্বস্ততা হারায়।
খুবই আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করা যায়, ইংল্যান্ড প্রত্যাগত কিছু উচ্চশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে এই বীজ বপন করা হয়। ভাবতে অবাক লাগে, উচ্চশিক্ষিত এসব তরুণের মধ্য থেকেই ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্ম হয়। হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় জাতীয়তাবাদী চিন্তার উন্মেষ ঘটায়
সংস্কৃতির একটা প্রধান চালিকা এবং লালনের কাজটি করে থাকে শিক্ষা। একটি দেশে নানা ধরনের শিক্ষা, বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা নিজ নিজ ক্ষেত্রে একপেশে শিক্ষার জন্ম দেয় এবং শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুতই বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে না, বরং সংঘাতের জন্ম নেয়। এই সংঘাত গুরুতর আকার ধারণ করে, যখন কোনো অভ্যুত্থান বা আন্দোলন শুরু হয়। এই পর্যায়ে কোনো যুক্তিনির্ভরতা কাজ করে না। যখন যুক্তিনির্ভরতা অনুপস্থিত থাকে, তখন ফ্যাসিবাদ এসে ভর করে। এসবও নীরবে ঘটতে থাকে। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির সময় ইতালি বেড়াতে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের যিনি দোভাষী ছিলেন, তিনি মুসোলিনির লোক। সেই দোভাষী তাকে নিয়ে মুসোলিনির কীর্তিগাথা দেখালেন। রবীন্দ্রনাথ আবেগাপ্লুত হয়ে কিছু প্রশংসাসূচক কথাও বললেন। এরপর ইতালি থেকে ফিরে রোম্যাঁ রোল্যাঁর সঙ্গে দেখা হয়। রোম্যাঁ রোল্যাঁ তখন তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে মুসোলিনির শাসনকে একটা ফ্যাসিবাদী শাসন হিসেবে বর্ণনা করেন। রবীন্দ্রনাথ হতচকিত হয়ে যান এবং নতুন করে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে লেখেন। মুসোলিনি এবার প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তাতে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের কিছু যায়-আসেনি। ফ্যাসিবাদ এমন একটি বিষয়, যা যৌক্তিকভাবে বিবেচনার বিষয়। কোথায় তা কীভাবে লুকিয়ে থাকে, তা কোনো তাৎক্ষণিক বিষয় নয়।
প্রাচ্যদেশীয় মানুষের মধ্যে আবেগ খুব প্রবল। অন্যায় দেখলে মুহূর্তেই তারা আবেগপ্রবণ হয়ে যান এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং রাষ্ট্রনায়কদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সচেতনভাবে উল্টেপাল্টে দেখা প্রয়োজন। সেই দেখার দৃষ্টি যদি না থাকে, তাহলে জনগণ বারবার বিভ্রান্ত হবে। আমাদের ইতিহাস এক বঞ্চনার ইতিহাস। আমরা আধো ঘুম এবং আধো স্বপ্নে বেঁচে থাকি। তাৎক্ষণিক স্বপ্নের মোহে আমরা বড় বড় ভুল করে থাকি। এই ভুলগুলো না করে আমরা যদি যুক্তি দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র এবং চলমান রাজনীতিকে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে ফ্যাসিবাদের উত্থানকে আমরা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে পারি।
লেখক: নাট্যকার







