বাবাকে দাফনের পর জানা গেল ছেলেই ‘হত্যাকারী’
- পরিবার ভেবেছিল স্বাভাবিক মৃত্যু
- সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে হত্যার ঘটনা
- বাবার সঙ্গে মতবিরোধ ছিল ছেলে আশরাফের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ছয়তলা বাড়ির চতুর্থ তলায় তিন ছেলেসহ যৌথ পরিবারে বাস করতেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। গত ২৭ জুন মারা যান তিনি। স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাকে দাফন করেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু কয়েক দিন পেরোতেই ঘুরে যায় পুরো ঘটনার মোড়। বাসায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে জানা যায়, হত্যার শিকার হয়েছেন ফরিদ উদ্দিন। আর হত্যাকারী হিসেবে পরিবারের সদস্যদের সামনে আসে তারই ছেলে আশরাফ উদ্দিন আলীর নাম। এরপরের ঘটনা ঘটে যায় বেশ দ্রুত। ফুটেজসহ অন্যান্য প্রমাণ নিয়ে আদালতে মামলা করেন ফরিদের আরেক ছেলে আল আমিন আহমেদ। সেই মামলায় আশরাফ উদ্দিন আলীকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পুলিশ।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আল আমিন আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, এটা আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবে তাকে শেষ বিদায় দিয়েছি। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে বাবার হত্যাকাণ্ড দেখতে পেয়ে মর্মাহত হয়েছি। এখন পরিবারের সবার চাওয়া, তার যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক জাফর আহমেদ জানালেন, মামলার তদন্ত মাত্রই শুরু হয়েছে। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তার সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যাচ্ছে। ভিকটিমের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হলে মৃত্যুর কারণ উঠে আসবে বলেও জানালেন তিনি।
এর আগে ৭ আগস্ট নিহতের ছেলে আল আমিন আহমেদ ঢাকার আদালতে মামলার আবেদন করেন। এতে বড় ভাই আশরাফ উদ্দিন আলীকে আসামি করেন তিনি। শুনানি শেষে আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে খিলগাঁও থানা-পুলিশকে নির্দেশ দেন। ওইদিন অভিযোগটি থানায় হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। মামলার পর গত সোমবার রাত ৮টার দিকে খিলগাঁও থেকে আশরাফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করলে ঢাকার মহানগর হাকিম মঞ্জুরুল ইসলাম জামিন নামঞ্জুর করে তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
সিসিটিভি ফুটেজে বিশ্লেষণ: ফরিদ উদ্দিন মারা যাওয়ার দিন বাদী আল আমিনের সৎমা রেখা বেগম বাসায় ছিলেন না। কয়েক দিন পর বাড়ি ফিরে স্বামীর মৃত্যুর দিন বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য তিনি সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে থাকেন। এই সময় তিনি দেখতে পান, ঘটনার দিন বিকাল ৪টার দিকে আসামি আশরাফ বাসায় প্রবেশ করেন। তখন নিজের ঘরসহ বাড়ির অন্যান্য ঘরেও তাকে যেতে দেখা যায়। এরপর বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে বাবার কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে ফরিদ উদ্দিনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিকাল ৫টার সময় আশরাফ তার বাবা ফরিদের কক্ষ থেকে বের হন। এরপর তার নিজ ঘরে যান। তখন তার ফুফু সেলিনা বেগম বাবার অসুস্থতা এবং হাসপাতালে নেওয়ার কথা জানালেও তিনি স্বাভাবিক আচরণ করেন। কিন্তু হাসপাতালে যাননি। এই ফুটেজ দেখেই বাবাকে হত্যার অভিযোগে ছেলে আশরাফকে আসামি করে মামলা করা হয়।
বাবার সঙ্গে বিরোধের অভিযোগ: পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ফরিদ উদ্দিনের নামে ছয়তলা বাড়িটি রাজউকের নকশা অনুযায়ী ১২ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদিত। আসামি আশরাফ ছয়তলার ওপর অংশে আরও কয়েকটি তলা নির্মাণের জন্য তার পরিচিত একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করেন। তবে তিনি বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেননি। ডেভেলপার কোম্পানির প্রস্তাবে এবং শর্তে তার বাবা রাজি না হওয়ায় আশরাফের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আশরাফ তার বাবাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং একপর্যায়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিভিন্ন সময় আশরাফকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।






