অর্গানিকের ভেজাল যাচাই করবে কে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভেজালের এ সময়ে নিরাপদ খাবারের খোঁজে মানুষ যখন মরিয়া, তখন সেই চাহিদা পুঁজি করে বড় হচ্ছে ‘অর্গানিক’ পণ্যের বাজার। সাধারণ বাজারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দাম দিয়েও মানুষ কিনছেন অর্গানিক চাল, ডাল, সবজি, মাছসহ নানা খাদ্যপণ্য। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে সুপারশপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অসংখ্য ‘অর্গানিক’ পণ্যের দোকান। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশে এ বাজারের আকার কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তরই নেই— বাজারে বিক্রি হওয়া এসব পণ্য সত্যিই অর্গানিক কি না, তা যাচাই করবে কে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্গানিক পণ্য বিক্রির জন্য রয়েছে কঠোর আইন, নির্দিষ্ট মানদণ্ড, স্বতন্ত্র সনদায়ন সংস্থা, পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই এবং পণ্য শনাক্তের ব্যবস্থা। অথচ বাংলাদেশে অর্গানিক পণ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞাই নেই। ফলে যে কেউ সাধারণ বাজার থেকে একটি পণ্য কিনে আকর্ষণীয় প্যাকেট ও ‘অর্গানিক’ স্টিকার লাগিয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করলেও তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর কাঠামো নেই। নিরাপদ খাবারের আশায় বেশি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে গিয়ে ভোক্তা তাই উল্টো ভেজালের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নাজিম উদ্দিন বলেছেন, ভোক্তারা বেশি দাম দিয়েও বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাবার কিনতে চান। অসাধু ব্যবসায়ীরা সেই চাহিদাকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রও একসময় যাচাইহীন ও সনদহীন ভুয়া অর্গানিক লেবেলের সংকটে ছিল। পরে বিশেষ কমিশনের সুপারিশে ‘ন্যাশনাল অর্গানিক স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড’ গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশেও ২০১৬ সালের নীতির আলোকে স্বাধীন ও বহু অংশীজনভিত্তিক একটি বোর্ড গঠন করা গেলে জালিয়াতি বন্ধের পাশাপাশি প্রকৃত জৈব উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে অর্গানিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে জনস্বাস্থ্যের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও নিরাপদ খাবার নিয়ে মানুষের আতঙ্ক। শাকসবজি ও মাছে অতিরিক্ত কীটনাশক, ফরমালিনসহ নানা রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ মানুষকে বিকল্প খাবারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগে সেই উদ্বেগকে পুঁজি করে অর্গানিক পণ্যের নামে প্রতারণার বাজার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
অথচ এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিগত উদ্যোগও একেবারে ছিল না, তা নয়। ২০১৬ সালে সরকার ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি’ প্রণয়ন করে। ওই নীতিতে অর্গানিক পণ্যের জন্য সনদ প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়নি। ফলে দেশে কে অর্গানিক উৎপাদক, কোন পণ্য অর্গানিক এবং কোন মানদণ্ডে একটি পণ্যকে অর্গানিক বলা হবে— এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক জৈব কৃষি ফেডারেশনের বৈশ্বিক তালিকায়ও বাংলাদেশের অর্গানিক সনদায়নের অবস্থান কার্যত শূন্য।
এ অনিয়ন্ত্রিত বাজারের সবচেয়ে বড় অসংগতি ধরা পড়ে উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাবেই। কৃষি তথ্য ও গবেষণার হিসাবে, দেশের মোট কৃষিজমির মাত্র শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশে জৈব চাষ হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ৫০০ বিঘা জমিতে এক বিঘারও কম জমিতে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। অথচ দেশের শত শত ফেসবুক পেজ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, দোকান ও সুপারশপে সারা বছর অর্গানিক চাল, ডাল, সবজি ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ দেখা যায়। প্রশ্ন উঠছে, এত সামান্য জমিতে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে এত বড় বাজারের চাহিদা কীভাবে পূরণ হচ্ছে?
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ অসামঞ্জস্যের একটি বড় কারণ হতে পারে সাধারণ বাজারের পণ্যকে অর্গানিক পরিচয়ে বিক্রি করা। অর্থাৎ পাইকারি বাজার থেকে কম দামে পণ্য কিনে শুধু প্যাকেট ও লেবেল পরিবর্তন করে ‘অর্গানিক’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ভোক্তা একই সঙ্গে দুই দিক থেকে প্রতারিত হচ্ছেন— একদিকে সাধারণ বাজারের পণ্যে থাকা সম্ভাব্য রাসায়নিক ঝুঁকি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সেই পণ্যকেই অর্গানিক মনে করে কয়েকগুণ বেশি দাম দিচ্ছেন।
তবে প্রকৃত জৈব কৃষকের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। চারপাশের জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার থাকলে একটি জমিকে পুরোপুরি রাসায়নিকমুক্ত রাখা কঠিন। বাতাস, সেচের পানি, খাল কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে পাশের জমির রাসায়নিক একটি জৈব জমিতেও পৌঁছাতে পারে। বারির তথ্য অনুযায়ী, ভেজাল কীটনাশক ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে কৃষকদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করেন। ফলে কোনো জমিতে রাসায়নিক ব্যবহার না করলেই সেই জমির ফসলকে বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ ‘কেমিক্যালমুক্ত’ বলে দাবি করার সুযোগ নেই। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এসব ফসলকে তুলনামূলক নিরাপদ বলা গেলেও ‘বিষমুক্ত’ বলা আলাদা বিষয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন বলেছেন, বিষমুক্ত উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার না করে কোনো পণ্যকে ‘বিষমুক্ত’ বা ‘অর্গানিক’ দাবি করা শাস্তিযোগ্য হওয়া উচিত। শুধু শহরের খুচরা দোকান কিংবা সুপারশপে অভিযান চালিয়ে এ প্রতারণা বন্ধ করা যাবে না; নজরদারি করতে হবে উৎপাদন পর্যায় থেকেই। অননুমোদিত কীটনাশক বা ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এ কাজে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পানিসম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থা দেখলে বাংলাদেশের ঘাটতিটা আরও স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অর্গানিক খাদ্যের জন্য রয়েছে ‘অর্গানিক ফুডস প্রোডাকশন অ্যাক্ট, ১৯৯০’ এবং ইউএসডিএর অধীনে ‘ন্যাশনাল অর্গানিক প্রোগ্রাম’। সেখানে বিজ্ঞানী, কৃষক, পরিবেশবিদ ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘ন্যাশনাল অর্গানিক স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড’ অর্গানিক উৎপাদনের মানদণ্ড নির্ধারণ ও পর্যালোচনা করে। নির্ধারিত নিয়ম না মেনে অর্গানিক লেবেল ব্যবহার করলে জরিমানাসহ শাস্তির বিধান রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নেও অর্গানিক পণ্যের জন্য রয়েছে অভিন্ন আইনি কাঠামো। নির্দিষ্ট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ মান পূরণ না করলে কোনো পণ্যকে অর্গানিক হিসেবে বাজারজাত করার সুযোগ নেই। পণ্যের পরিচয় নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয় ‘ইউরো-লিফ’ লোগো। ভারতের বাজারেও রয়েছে ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর অর্গানিক প্রোডাকশন (এনপিওপি), অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য ‘Jaivik Bharat’ লোগো এবং ছোট কৃষকদের জন্য গোষ্ঠীভিত্তিক ‘PGS-India’ সনদায়ন ব্যবস্থা। ভুয়া লেবেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সেখানে শাস্তির বিধান রয়েছে। চীনেও অর্গানিক পণ্যের নিজস্ব সনদায়ন ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে ভোক্তা পণ্যটি কোন খামার থেকে এবং কখন এসেছে, তা শনাক্ত করতে পারেন।
অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী অর্গানিক পণ্যের স্বীকৃতি কোনো মুখের দাবি কিংবা প্যাকেটের স্টিকারের ওপর নির্ভর করে না। সেখানে আইন থেকে শুরু করে উৎপাদন, পরীক্ষা, সনদায়ন, লেবেলিং এবং বাজারজাতকরণ— প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নজরদারি। বাংলাদেশে সেই কাঠামোর অনুপস্থিতিই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ফলে একদিকে প্রকৃত জৈব কৃষক সনদ ও বাজারের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা অর্গানিক শব্দটিকে ব্যবহার করছেন বাড়তি দামে পণ্য বিক্রির হাতিয়ার হিসেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়— নিরাপদ খাবারের জন্য মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিই যদি প্রতারণার নতুন বাজারে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু ভোক্তার অর্থের নয়, জনস্বাস্থ্যেরও। তাই অর্গানিক পণ্যের বাজারকে শুধু ব্যবসায়িক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
বাংলাদেশে অর্গানিক বা জৈবচাষ এখনো খুব ছোট একটি জগৎ। দেশের মোট কৃষিজমির মাত্র ০.১৯ শতাংশ জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। সহজ করে বললে, ৫০০ বিঘা কৃষিজমির মধ্যে এক বিঘারও কম জমিতে চলছে এই চাষপদ্ধতি। দেশে অর্গানিক চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার হেক্টর। আর এ পদ্ধতিতে চাষ করেন আনুমানিক ১২ হাজার কৃষক।
কিন্তু অর্গানিক পণ্যের বাজারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। হিসাব বলছে, দেশে প্রকৃতপক্ষে উৎপাদিত অর্গানিক পণ্যের বাজারমূল্য বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। অথচ বাজারে ‘অর্গানিক’ পরিচয়ে বিক্রি হওয়া পণ্যের মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা।
এই দুই হিসাবের ফারাকই তৈরি করছে বড় প্রশ্ন—বাজারে যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ‘অর্গানিক’ নামে বিক্রি হচ্ছে, তার সবটাই কি সত্যিই অর্গানিক?
দামের দিক থেকেও পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। যেমন, সাধারণ বাজারে ৫০০ গ্রাম ঘির দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু একই ঘি ‘অর্গানিক’ দাবি করে বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ দাম প্রায় দ্বিগুণ।
এক কেজি সাধারণ চালের দাম যেখানে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, সেখানে ‘অর্গানিক’ লেখা চালের দাম উঠছে ১২০ থেকে ১৮০ টাকা—কখনো কখনো সাধারণ চালের চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি।
একই চিত্র সরিষার তেলেও। সাধারণ বাজারে এক লিটার সরিষার তেল কিনতে লাগে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা। কিন্তু ‘অর্গানিক’ দাবি করা তেলের জন্য ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
অর্থাৎ, ‘অর্গানিক’ শব্দটি পণ্যের গায়ে লাগলেই তার দাম বেড়ে যাচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ। অথচ দেশের প্রকৃত অর্গানিক উৎপাদনের পরিমাণ সেই তুলনায় খুবই কম।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—অর্গানিকের চাহিদা কি সত্যিই এত বেশি, নাকি ‘অর্গানিক’ নামের আড়ালে তৈরি হচ্ছে বড় এক বাণিজ্য?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকৃত অর্গানিক বাজার দাঁড় করাতে চারটি বিষয় অপরিহার্য— আইন, স্বতন্ত্র সনদায়ন সংস্থা, পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই এবং পণ্য শনাক্তের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এ চার স্তরের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ‘অর্গানিক’ শব্দটিই এখন অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়তি দামে পণ্য বিক্রির হাতিয়ার।






