পাশের ফ্ল্যাটে শব্দ, দরজা খুলতেই বেরোলো খণ্ডিত দেহ
- যাত্রাবাড়ীতে গৃহবধূ হত্যা

স্বামী দুলাল হাওলাদারের সঙ্গে শিরিন বেগম
রাত ২টা। খাওয়া-দাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছিলেন বাড়ির মালিক খোরশেদ আলম। হঠাৎ পাশের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসে সন্দেহজনক শব্দ। প্রথমে মনে হচ্ছিল গাড়ির শব্দ। পরক্ষণেই ভুল ভাঙে। মনে হয় কোপানোর শব্দ।
৮-১০ দিন আগে ভাড়া নেওয়া পাশের ফ্ল্যাটের ভেতর তখন আলো জ্বলছে। বাথরুমের জানালা যতটা চোখে পড়ে, সেখানে আলো জ্বলছিল আর নিভছিল। সন্দেহ লাগে খোরশেদের। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত ছুটে যান পাশের দরজায়। শুরু হয় একের পর এক কড়া নাড়া। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দরজা খোলে। কিন্তু ভেতরে যে দৃশ্য অপেক্ষা করছিল, তা কল্পনাকেও হার মানায়।
রান্নাঘরে পড়ে ছিল শিরিন বেগমের (৪২) খণ্ডিত দেহ। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা, কোমর থেকে আলাদা দুই পা। গায়ে পোশাক ছিল না। চারদিকে রক্তের চিহ্ন। আর ঘরের ভেতরেই ছিলেন তার স্বামী দুলাল হাওলাদার (৫০)। অভিযোগ, স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ টুকরা করে রান্নাঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এমনকি হত্যার আলামত আড়াল করতে রক্তের দাগও মুছে ফেলার চেষ্টা করেন দুলাল।
গত রবিবার মধ্যরাতে রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর একটি পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় ঘটে এই হত্যাকাণ্ড। বাড়ির মালিকের ধারণা, দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করার কারণেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন দুলাল। উদ্ধার হয় শিরিনের খণ্ডিত মরদেহ। নইলে মরদেহ গুমের সুযোগ পেতেন দুলাল।
খোরশেদের ভাষ্য, দুলাল-শিরিনের মধ্যে আগে থেকেই মনোমালিন্য ছিল। ঘটনার আগের দিনও ঝগড়া হয়েছিল। শিরিনকে মারধরের কথাও শুনেছিলেন। সন্ধ্যার পর তিনি দুজনকে বুঝিয়ে শান্ত করেন। রাত ৮টার দিকে তাদের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়।
পরে পাশের বাসা থেকে কোনো চিৎকার বা হইচই শোনা যায়নি। কিন্তু গভীর রাতে কোপানোর শব্দ তার মনে সন্দেহ তৈরি করে। দ্রুত পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজায় নক করতে থাকেন তিনি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দরজা খোলা হলে তাকে জানানো হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিটমাট হয়ে গেছে। কিন্তু শিরিনকে ডেকেও কোনো সাড়া পাননি তিনি। একপর্যায়ে চাপের মুখে দুলাল জানান, শিরিন মারা গেছেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ।
টাকা নিয়ে বিরোধ, ছিল সন্দেহ
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, শিরিন দীর্ঘদিন জর্ডানে কাজ করতেন। দুই মাস আগে শাশুড়ির মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফেরেন। এরপর স্বামীকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকছিলেন।
যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা মামলার বাদী তাদের ছেলে সিরাজ হাওলাদারের অভিযোগ, শিরিন দেশে ফেরার পর থেকেই তার বাবা দুলাল টাকা চাইতেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায় বিরোধ হত। স্বামীর নির্যাতনের বিষয়টি শিরিন গাজীপুরে থাকা ছেলে ও চট্টগ্রামে থাকা মেয়েকে জানাতেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার দুলালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিরিন বিদেশে যাওয়ার পর তাকে ঠিকমতো টাকা দিতেন না। এ ছাড়া ফোনে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলা নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, রবিবার রাতে রাতে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে দুলাল স্ত্রীর মাথা ধরে দেয়ালে আঘাত করেন। এতে শিরিন জ্ঞান হারান। এরপর দুলাল বটি দিয়ে স্ত্রীর মাথা ও দুই পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখেন।
আলামত মুছে লাশ গুমের চেষ্টা
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে টুকরা করার বিষয়টি সামনে এসেছে। রান্নাঘরে রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে মরদেহের খণ্ডিত অংশগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার আগেই বাড়ির মালিকের তৎপরতায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়।
সোমবার ভোররাতে পুলিশ বাসা থেকে শিরিনের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকেই তার স্বামী দুলালকে আটক করা হয়। পরে ছেলে সিরাজ হাওলাদারের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
দুই সন্তানের কাছে ফেরা হলো না
নিহত শিরিনের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বিখাখালি গ্রামে। বাবা মৃত সোহরাব আলী। স্বামী দুলালের বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার রাজপাশা গ্রামে। তার বাবার নাম নুরুল হক হাওলাদার।
শিরিনের ছেলে সিরাজ গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেয়ে থাকেন চট্টগ্রামে, স্বামীর সঙ্গে। পরিবারের সদস্যদের জন্য উপার্জন করতে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয় শিরিনকে। দেশে ফেরার পর নতুন করে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে শিরিনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কেন এবং কী পরিস্থিতিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এর পেছনে আর কোনো কারণ ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।




