বাণিজ্যমেলার মাঠ নিয়ে টানাটানি, শেকৃবির সাইনবোর্ড উধাও
- মাঠের মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)
- এই মাঠেই হচ্ছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়

বাণিজ্য মেলার মাঠে শেকৃবির পক্ষ থেকে এ সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। এটি এখন আর নেই। ছবি: আগামীর সময়
রাজধানীর আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকা সংলগ্ন মাঠে আগে জানুয়ারিতে হতো মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা। এ মাঠে বছরের বাকি সময়ে কোনো কার্যক্রম সেভাবে থাকত না। এরপর বাণিজ্য মেলা রাজধানীর অন্যপ্রান্ত পূর্বাচলের স্থায়ীকেন্দ্রে চলে গেলে এ মাঠ সারা বছরই থাকে ফাঁকা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে সেই ফাঁকা মাঠের মালিকানা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি। একদিকে সরকার অন্যদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। দুই পক্ষই মাঠের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করে টাঙিয়ে দিয়েছিল সাইনবোর্ড। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই শেকৃবির টাঙানো দুটি সাইনবোর্ড আর দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা কিছুই জানেন না। এ ছাড়া ডিসি অফিসে মাঠটির দখল পেতে আবেদন করার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মাঠটি ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পশ্চিম প্রান্তে গাছ লাগিয়েছে সেনাবাহিনী। বিভিন্ন স্থানে ফুটেছে কাশফুল। গাছের নিচে ছায়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। সেখানে থাকা টং দোকানে চলছে চা-বিস্কুট বিক্রি।
আরও দেখা যায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুই প্রান্তের দুটি সাইনবোর্ড অক্ষত রয়েছে। নেই শেকৃবির সাইনবোর্ডগুলো।
এ বিষয়ে মাঠের আশপাশে থাকা লোকজনের কাছে জানতে চাইলে, তারা জানালেন, সাইনবোর্ড কে বা কারা সরিয়েছেন সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।
শেরেবাংলা নগর মৌজায় অবস্থিত মাঠটির আয়তন ২৯ দশমিক ৭৯ একর। এতদিন এ জায়গাটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানেই ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাঠটি নিজেদের বলে দাবি করে শেকৃবি। এ নিয়ে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে মাঠটি বুঝিয়ে দিতে আবেদন জানানো হয়। পাশাপাশি মাঠে টাঙিয়ে দেওয়া হয় সাইনবোর্ডও।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘গবেষণা মাঠ, (প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা ১২০৭।’ এ ছাড়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্ররাও আলাদা করে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, যখন শেকৃবির জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তখন পাশের পরিকল্পনা কমিশন ও মন্ত্রণালয়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ও বাণিজ্য মেলা মাঠসহ পুরো এলাকা এর আওতায় ছিল। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ অন্য স্থাপনা তৈরি করায় তখন মুখ খোলেনি তারা। এবার যেহেতু মাঠ ফাঁকাই আছে সুতরাং এখন সময় এসছে দখলে নেওয়ার।
শেকৃবির রেজিস্ট্রার নজরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এক সময় খামারবাড়ী পর্যন্ত আমাদের ছিল। শেরেবাংলা নগরের পুরো এলাকায় আমাদের ৫০০ একর জমি ছিল। এখন কমতে কমতে ৮৭ একরে ঠেকেছে। আমরা চাইছি এ জায়গাটা আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’
এটি পেলে গবেষণা কার্যক্রমে সুবিধা হবে বলে দাবি করেছেন শেকৃবির রেজিস্ট্রার। তিনি বললেন, ‘এটি পেলে আমাদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে সুবিধা হতো। কেননা শিক্ষার্থীর তুলনায় আমাদের গবেষণা মাঠ সীমিত। তবে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা মেনে নেব।’
সাইনবোর্ডের বিষয়ে তার দাবি, ‘আমাদের ছাত্ররা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল। আমি জানি না সাইনবোর্ড কে তুলে নিয়েছে। আর আমরা ঢাকা ডিসি অফিসে যে আবেদন করেছিলাম সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।’
এদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শেকৃবির মাঠ দখলের তৎপরতা দেখে নিজেরাও দুটি সাইনবোর্ড টাঙায়। সেখানে লেখা আছে, ‘এই জমির মালিক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর পক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই জমিতে কোনো প্রকার অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ। নির্দেশক্রমে গণপূর্ত অধিদপ্তর।’
এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হচ্ছে, ‘এটি আমাদের জমি। কেউ দাবি করলেইতো হবে না। আইন-কানুন আছে।’
তবে শেকৃবির সাইনবোর্ড কারা সরিয়েছে সে বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানে না বলেই দাবি করা হয়েছে।
এ মাঠেই হবে বিভগীয় কমিশনারের কার্যালয়
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে তৈরি হচ্ছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনের নিজস্ব কার্যালয়। এজন্য ‘শেরে বাংলা নগরে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অফিস ভবন নির্মাণ’ নামের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।
প্রস্তাবটি নিয়ে এরই মধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রক্রিয়াকরণ শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে জনপ্রশান মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ন অধিদপ্তর।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, ঢাকা বিভাগ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় কেন্দ্রীয় সরকার ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় সাধন, বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম তদারকি, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যক্রম, বিভিন্ন সভা ও সমন্বয় কার্যক্রমসহ সরকারের নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়টি সেগুনবাগিচায় অবস্থিত।
এতে আরও বলা হয়, বিদ্যমান ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনায় স্থান সংকট দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আগারগাঁওস্থ শের-ই-বাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া ২ দশমিক ৩৭ একর জমিতে অফিস কাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া জমিতে ২টি বেজমেন্টসহ ১০তলা অফিস ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের জন্য পর্যাপ্ত ও আধুনিক কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হবে।




