অনিবন্ধিত রেস্তোরাঁ বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকাকে এখন রেস্তোরাঁর শহর বললে ভুল হবে না। ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, যেখানেই জায়গা পাওয়া গেছে, গড়ে উঠেছে ছোট-বড় খাবারের দোকান। নগরবাসীর বড় বিনোদনের জায়গাও এসব রেস্তোরাঁই। ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যবসায় নামা এসব প্রতিষ্ঠানে বাহারি খাবার তো বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু খাবারগুলো আদৌ নিরাপদ কি না, তা দেখার নেই কেউ। এমনকি রেস্তোরাঁগুলোয় সরকারের প্রয়োজনীয় সব সংস্থার অনুমোদন আছে কি না, তাও জানার উপায় নেই।
ফাহিমা নুসরাত বাইরে খেতে পছন্দ করেন। জন্মদিন বা অন্য কোনো উপলক্ষে তো বটেই, রান্না করতে ভালো না লাগলেও চলে যান রেস্তোরাঁয়। কী দেখে রেস্তোরাঁ বাছাই করেন, জানতে চাইলে বললেন, ‘ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপের রিভিউ দেখি। আবার সাজসজ্জা পছন্দ হলেও ঢুকে যাই। কোনোটিতে খাবার সত্যিই ভালো লাগে, কোনোটিতে একদমই লাগে না। কিন্তু না খেলে আগে থেকে তো আর স্বাদ বোঝার উপায় নেই, তাই না?’
রেস্তোরাঁর সরকারি অনুমোদন আছে কি না কিংবা খাবারগুলো নিরাপদ কি না, সে বিষয়টি মাথায়ই থাকে না; স্বীকার করলেন এই নারী। ফাহিমার মতো এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা রেস্তোরাঁয় অনেক টাকা দিয়ে খাবার কিনে খান ঠিকই; কিন্তু সে খাবারের মান, সরকারের নিবন্ধন, রান্নাঘরের পরিবেশ নিয়ে মাথা ঘামান না।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১২৮টি। এর বাইরে ঢাকার পাঁচ উপজেলার মধ্যে শুধু সাভারের ছয়টি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স রয়েছে
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪ লাখ ৮২ হাজার, যার প্রায় ৮০ ভাগই অনিবন্ধিত। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২০২৪ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের সব সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকায় রেস্তোরাঁ ব্যবসা করছে মাত্র ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১২৮টি। এর বাইরে ঢাকার পাঁচ উপজেলার মধ্যে শুধু সাভারের ছয়টি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স রয়েছে।
দেশে প্রতিনিয়ত রেস্টুরেন্টের সংখ্যা বাড়লেও বাড়ছে না সরকার কর্তৃক অনুমোদিত রেস্টুরেন্টের সংখ্যা। অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র গড়ে উঠছে রেস্তোরাঁ।
একটি রেস্তোরাঁ খোলার জন্য পূর্ণ অনুমোদন পেতে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী বেশ কিছু শর্ত মানতে হয়। এতে রান্নাঘর ও পরিবেশনা এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, জীবাণুমুক্ত এবং স্বাস্থ্যসম্মত রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে পোকামাকড় বা ইঁদুরের উপদ্রব থাকা যাবে না এবং নিশ্চিত করতে হবে নিয়মিত পেস্ট কন্ট্রোল। নিরাপদ পানির ব্যবহার তো করতেই হবে, থাকতে হবে সঠিক বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থাও। কাঁচা মাছ, মাংস এবং রান্না করা খাবার বা ফলমূল আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে জীবাণু ছড়িয়ে না পড়ে। খাবার সংরক্ষণ করতে হবে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়।
বেশ কয়েকটি অনিবন্ধিত রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেল, এ আইন বিবেচনাই করা হচ্ছে না। যেহেতু নিবন্ধনই নেই, তাই জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে তাদের যেতে হচ্ছে না নিরাপদ খাদ্য আইন মানার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে বাইরের চাকচিক্য দেখে অনুমোদনহীন নামিদামি এসব রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
কেন ব্যবসায়ীরা নেন না যথাযথ অনুমোদন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। তারা বলছেন, লাইসেন্স প্রক্রিয়া জটিল। নিতে হয় একাধিক দপ্তরের অনুমোদন। মালিক সমিতির সদস্যরা জানালেন, একটি রেস্তোরাঁ চালু করতে প্রায় ১০-১২টি সনদের প্রয়োজন হয়। আর এই সনদ পেতে সময় লেগে যায় কয়েক মাস। এতে খরচ ও ভোগান্তি দুটিই বাড়ে। আবার সেই লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে ফের পড়তে হয় সরকারি দপ্তরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়।
তা ছাড়া, লাইসেন্স আছে কী নেই, তাও নিয়মিত তদারকি করা হয় না। ভোক্তাদের যেহেতু তেমন মাথাব্যথা নেই, তাই ব্যবসায়ীরাও এত ঝামেলায় যেতে চান না।
বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামে একটি ভবনের রেস্তোরাঁ থেকে লাগা আগুনের পর বিভিন্ন আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে রাজউকের নকশা বহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা রুফটপ ও অন্য রেস্তোরাঁগুলোর ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোতেও ব্যাপক কড়াকড়ি ও স্থবিরতা চলছে। ফলে নিবন্ধিত রেস্তোরাঁর সংখ্যা আরও কমে গেছে।
নিবন্ধিত রেস্তোরাঁগুলোর মালিকরা বলছেন, তারা নিয়মিতভাবে বিক্রির ওপর ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা অনিবন্ধিত, তারা কর ফাঁকি দিচ্ছে। ফলে তারা অন্যদের তুলনায় কম দামে খাবার বিক্রি করছে। এতে ক্রেতারা সেই রেস্তোরাঁগুলোয় ভিড় করছেন। দিনশেষে লোকসানে পড়ছেন নিবন্ধন থাকারাই।
২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) নিবন্ধিত হোটেল ও রেস্তোরাঁর মোট সংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার ৭৪৩। এর মধ্যে হোটেল রয়েছে ৩ হাজার ১১৫টি এবং রেস্তোরাঁ ১০ হাজার ৬২৮টি। সে হিসাবে মাত্র ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দেওয়ায় তুলনামূলক কম দামে খাবার বিক্রি করছে। এতে সরকার নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
নিজের রেস্তোরাঁর লাইসেন্স করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার কথা জানান নবাবী ভোজের মালিক দীপু চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, ২০১৪ সালে মোহাম্মদপুরে রেস্তোরাঁ চালু করে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন এবং সব ধাপ শেষে ২০১৭ সালে গিয়ে পূর্ণ অনুমোদন পান।
‘স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং এনবিআরের নিবন্ধন না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দেওয়ায় তুলনামূলক কম দামে খাবার বিক্রি করছে। এতে সরকার নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ যে কারণে লালবাগ ও মোহাম্মদপুরে তার দুটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলেও জানালেন।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বললেন, ‘সরকার রেস্তোরাঁর অনুমোদন সহজ করে দিলে নিবন্ধিত রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়বে। পাশাপাশি কর সহনীয় মাত্রায় রাখা হলে সরকারের রাজস্বও বাড়বে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও সহজ হবে।’
কথা হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাইমের সঙ্গে। প্রায় ছুটির দিনই তিনি বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যান। কিন্তু সেগুলো নিবন্ধিত কি না, সে খোঁজ নেন না। যদি রেস্তোরাঁগুলো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন বলেও আশঙ্কার কথা জানালেন।
বাইরে খেয়ে মাঝে মাঝে অসুস্থ হলেও বিষয়গুলো সেভাবে ভেবে দেখেননি বলে জানালেন সুমাইয়া নামে এক তরুণী। তিনিও আকর্ষণীয় সাজসজ্জা দেখেই রেস্তোরাঁ বেছে নেন।
অংশগ্রহণকারী বিক্রেতার বেশিরভাগই ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই জীবনে কখনো খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ পাননি
দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে স্ট্রিট ফুডের দোকান। চারপাশে তাকালেই এর সত্যতা মেলে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমলসহ বিভিন্ন রাস্তার দুই ধারের ফুটপাত জুড়ে শুধু ফুডকার্ট। অল্প পুঁজি আর কোনো অনুমোদন না লাগায় সহজেই যে কেউ এ ব্যবসা শুরু করছেন। কিন্তু খাবার তৈরিতে মানছেন না কোনো স্বাস্থ্যবিধি।
২০২৪ সালে ঢাকার স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের খাদ্য পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক জ্ঞান বা ‘হাইজিন’ নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছি ‘নেচার’ জার্নালে। সেখানে দেখা যায় অংশগ্রহণকারী বিক্রেতার বেশিরভাগই ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই জীবনে কখনো খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ পাননি।
একের পর এক নিবন্ধনহীন রেস্তোরাঁ গজিয়ে উঠলেও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দাবি করছে নিয়মিত অভিযানের কথা। অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল বললেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। নিবন্ধনের বিষয়ে হেড অব অর্গানকে (দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল প্রতিষ্ঠান) জিজ্ঞেস করতে হবে। আমি শুধু তাদের হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে কাজ করছি।’
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিয়মিত রেস্তোরাঁ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে প্রশাসকের কাছে জমা দিচ্ছে বলে জানালেন নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসান। কিছু সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘আমাদের পাশের দেশগুলোয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে যেসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলো আমাদের এখানে নেই। নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার খরচ নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি তারা দিচ্ছে না। সেই উপকরণের খরচ দিচ্ছে ডিএসসিসি। আমরা ডিএসসিসি থেকে প্রতিনিয়ত রেস্তোরাঁগুলোয় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছি। প্রতি সপ্তাহে প্রশাসকের কাছে সেগুলোর রিপোর্টও জমা দিচ্ছি।’
ফুটপাতের দোকানগুলোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। হ্যান্ড গ্লাভসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে ক্রেতাদেরই চাপ দিতে হবে
সম্প্রতি সিরাজ চুইগোস্তের নমুনা সংগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, ‘নামিদামি রেস্টুরেন্ট হওয়ার পরও আমরা তাদের ঘি পরীক্ষা করে দেখেছি, সেখানে ১ শতাংশও দুগ্ধজাত উপাদান নেই। প্রতিনিয়তই এমন ঘটনা ঘটছে।’
নিবন্ধন না থাকলেই সব উচ্ছেদ করে কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাবে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তার মতে, ‘ফুটপাতের দোকানগুলোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। হ্যান্ড গ্লাভসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে ক্রেতাদেরই চাপ দিতে হবে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ-হোটেলগুলোয় সরকারি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত খাবারের নমুনা পরীক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে সবাইকে নিতে হবে প্রশিক্ষণের আওতায়।’
তা না হলে খাবার ও পানিবাহিত নানা রোগের প্রকোপ বাড়বে, যোগ করেন তিনি। এ ছাড়া খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শরীরে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট জমে দীর্ঘমেয়াদে তা ক্যানসার বা হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়াবে।






