বনদস্যুদের নির্যাতনে নদীতে ঝাঁপ, চার দিন পর ফিরল মেহেদী

বনদস্যুদের কবল থেকে ফিরে আসা কিশোর মেহেদী হাসান। ছবি: সংগৃহীত
একমাত্র ছেলেকে হারানোর শঙ্কায় বাকরুদ্ধ মা। প্রতিটি মুহূর্তে এলাকাবাসী বুক কেঁপেছে একটাই প্রশ্নে— ‘ছেলেটা কি আর বেঁচে আছে?’ চার দিন পর অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো।
সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে বনদস্যুদের নির্যাতনের ফলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টার চার দিন পরে ১৬ বছরের কিশোর মেহেদী হাসান ফিরে এসেছে মায়ের বুকে। কিন্তু তার শরীরজুড়ে এখনো নির্যাতনের ক্ষত, চোখেমুখে ভয়াবহ দুঃসহ স্মৃতির ছাপ।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের একটি খালে কাঁকড়া ধরতে যায় কয়রা উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের ভ্যানচালক মো. আব্দুল্লাহ সরদারের ছেলে মেহেদী হাসান। বন এলাকায় প্রবেশের কিছুক্ষণ পর তাকে অপহরণ করে আফজাল বাহিনীর সদস্যরা।
অপহরণের পর পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে দস্যুরা। অসহায় বাবা ধারদেনা করে ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করে তাদের হাতে পৌঁছে দিলেও পুরো টাকা না পাওয়ায় দস্যুরা মেহেদীকে মুক্তি দেয়নি। বরং তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
পরদিন শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে প্রবল বৃষ্টির সুযোগে জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে দস্যুদের নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন মেহেদী। এরপর নদীর স্রোত, বন আর অজানা আতঙ্কের মধ্যেই কেটে যায় কয়েকটি বিভীষিকাময় দিন। এ সময় পরিবারের কেউ জানতেন না— বেঁচে আছে মেহেদী, নাকি হারিয়ে গেছেন সুন্দরবনের অন্ধকারেই।
মেহেদীর সন্ধানে রবিবার শত শত গ্রামবাসী সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দিনভর খোঁজাখুঁজি চালান। কিন্তু কোনো সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। স্বজনদের কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
অবশেষে সোমবার বেদকাশী এলাকার একটি নৌকার মাঝি সুন্দরবন থেকে উদ্ধার করেন মেহেদীকে। খবর পেয়ে ছুটে যান স্বজনরা। দীর্ঘ অনাহার, বনদস্যুদের নির্যাতন এবং চার দিন বনে-নদীতে কাটানোর কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি আনা হয় মেহেদীকে।
উপকূলীয় জেলে ও স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় দোলা ভাই বাহিনীর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ছিল আফজাল। গত ২৭ জুন উপকূলরক্ষী বাহিনীর অভিযানের পর দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আফজালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নতুন একটি দস্যুচক্র। এরপর থেকেই সুন্দরবনে বেড়েছে জেলে ও বাওয়ালিদের অপহরণ, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা। এতে উপকূলীয় জনপদে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।
মেহেদীর চাচা আব্দুল বারী সর্দার বলেন, ‘সমবয়সী পাঁচজন মিলে স্থানীয় নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল মেহেদী। সেখান থেকে বনদস্যুরা জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। কষ্ট করে ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করে দিলে অন্য চারজনকে ছেড়ে দেয়। আর মেহেদীকে আটকে রেখে আরও বেশি টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় সে। আমরা ভেবেছিলাম ওকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না। গ্রামের মানুষকে নিয়ে বনেও খুঁজতে গিয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে তাকে জীবিত ফিরে পেয়েছি।’
কাশিয়াবাদ বন স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘কাঁকড়া ধরার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। মেহেদী নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারি। পরে উদ্ধারের জন্য তার স্বজনদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।’




