সোয়া লাখ কোটির গ্যাস সন্ধানে ৭২৯ কোটি
- চলমান গ্যাসসংকট কাটাতে তিন কূপ খননের উদ্যোগ বাপেক্সের
- একনেকে প্রকল্প প্রস্তাব উঠছে কাল
- ৭১১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা
- প্রকল্পটি সফল হলে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের আশা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভয়াবহ গ্যাসসংকটে ধুঁকছে দেশ। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্প কারখানা— সর্বত্রই হাহাকার এই জ্বালানির। এই সুযোগে চড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম। ফাঁকা হচ্ছে গ্রাহকের পকেট। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) দিয়েছে বড় এক সুখবর। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা তিনটি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে; যেখান থেকে মিলতে পারে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার গ্যাস।
বাপেক্স বলছে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা জোরদারে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন (অ্যাপ্রাইজাল-কাম-ডেভেলপমেন্ট) কূপ এবং দুটি অনুসন্ধানমূলক (এক্সপ্লোরেটরি) কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই তিন কূপ থেকে মিলতে পারে ৭১১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
‘একটি মূল্যায়ন-উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫) এবং দুটি অনুসন্ধানমূলক কূপ (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্রা-২) খনন’ নামের প্রকল্পটি আগামীকাল বুবধার উত্থাপন করা হচ্ছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে হতে যাওয়া বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ৫৮৩ কোটি ৩৭ লাখ এবং বাপেক্স নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বললেন, ‘দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা খুবই জরুরি। বিদেশ থেকে আমদানি করে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে প্রতি বছর জ্বালানি আমদানিতে যে বিপুল অর্থ খরচ হয়, এত টাকা আমাদের কোথায়? এজন্য সরকার চাচ্ছে দেশের মধ্যেই যে সম্ভাবনা আছে, সেটি কাজে লাগাতে। তাই আমরা গ্যাসকূপ-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে চায় সরকার। এজন্য দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন বৃদ্ধি প্রয়োজন। এমন বাস্তবতায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ (বেগমগঞ্জ-৬ এবং বেগমগঞ্জ-৫) এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুনেত্র ভূগঠনে একটি অনুসন্ধান কূপ (সুনেত্র-২) খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দৈনিক ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বেগমগঞ্জ অঞ্চলে বিদ্যমান কূপগুলো (বেগমগঞ্জ-৩ ও বেগমগঞ্জ ৪) থেকে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে। এসব নতুন কূপের সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রস্তাবিত তিনটি কূপ সফলভাবে খনন করা সম্ভব হলে এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আনুমানিক ৩৫ এমএমএসসিএফ (মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফিট) গ্যাস যুক্ত হবে। ফলে দেশের গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
সূত্র বলছে, কারিগরি মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭১১ বিসিএফ (বিলিয়ন কিউবিক ফুট)। এর বাজারমূল্য আমদানি করা এলএনজির সমমূল্য (১৩ দশমিক ১৪ ডলার/এমএমবিটিইউ ৬ হাজার ৬ টাকা/ঘনমিটার) বিবেচনায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে রাখবে কার্যকর ভূমিকা।
প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি খুব ভালো উদ্যোগ। বর্তমান সংকটময় সময়ে এমন উদ্যোগ বেশি বেশি নেওয়া উচিত। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেক বেশি। এক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে বাপেক্সের মাধ্যমে করায় আশা বেশি জেগেছে।’
অবশ্য তার ভাষ্য, ‘প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে কূপগুলো খনন করা হয়। এতে শতভাগ সাফল্য আশা করা যায় না। বিশ্বের কোথায় শতভাগ সফলতার নজির নেই। এর মধ্যেও বাংলাদেশ যাতে সফল হবে, তাই যথেষ্ট।’
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বেগমগঞ্জ-৫ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপের ৩ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরতায় খনন করা হবে। এ ছাড়া বেগমগঞ্জ-৬ অনুসন্ধান কূপ ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হবে। আর সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপটি খনন করা হবে ৫ হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায়। এর মধ্য দিয়ে টেস্টিং ও কমপ্লিশন সম্পন্ন করে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্বালানি খাত সম্পর্কিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও কূপ খননে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের কথা উল্লেখ আছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাপেক্সের অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে, যা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে। ফলে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেশীয় সম্পদের স্বচ্ছ, দক্ষ ও সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ার জন্য প্রকল্পটি কার্যকরভাবে সহায়ক হবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম: প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে যেসব কাজ করা হবে, সেগুলো হলো— ৩টি কূপ এলাকায় ১০ দশমিক ৬১ একর ভূমি হুকুমদখল ও উন্নয়ন করা। এ ছাড়া বেগমগঞ্জ-৫ ও বেগমগঞ্জ-৬ কূপ খননের জন্য রিগ ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য পূর্ত কাজ এবং এ দুটি কূপের জন্য স্থানীয় ও বৈদেশিক মালপত্র এবং সরঞ্জাম কেনা। পাশাপাশি বাপেক্সের নিজস্ব রিগ দিয়ে ৩ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরতায় বেগমগঞ্জ-৫ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ, ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতায় বেগমগঞ্জ-৬ অনুসন্ধান কূপ এবং সমন্বিত খনন অপারেশন (টার্ন-কি) ভিত্তিতে ৫ হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপ খনন করা।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৫৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংযোগ অনুযায়ী চাহিদা বিবেচনা করা হয় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। দেশে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি থেকে নিয়মিত উৎপাদন হচ্ছে। নতুন আবিষ্কৃত চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু হয়নি। অন্য পাঁচটি ক্ষেত্র পরিত্যক্ত দীর্ঘদিন ধরে।




