আড়াই হাজার টাকাতেও ভরছে না বাজারের থলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাধারণত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রেতারা বাড়িয়ে দেন পণ্য ও সেবার মূল্য। তবে এবার নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও এখনো সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় বাজারে এর বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি এখনো। এরপরও কাঁচাবাজারে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মানুষ। মাছ, মুরগি, ডিম, সবজিসহ সবকিছুর দামই বাড়তি।
মাসের শুরুতেই হাতে বেতন; কিন্তু বাজারের ব্যাগ হাতে নিতেই হিসাবের খাতা এলোমেলো। গত সপ্তাহে যে টমেটো ছিল কেজি ৯০-১০০ টাকা, সপ্তাহ না ঘুরতেই তা ঠেকেছে ১২০-১৩০ টাকায়। বেগুনও বেড়েছে ৮০-৯০ টাকা। এর সঙ্গে চাল, ডাল, তেল ও মসলার চড়া দাম— সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে হাঁসফাঁস করছেন নির্দিষ্ট আয়ে চলা মধ্যবিত্তরা। তাদরে কাছে টমেটো এখন বিলাসদ্রব্য, আবার সামান্য জিরা-এলাচ কিনতেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে কারও পকেট।
রাজধানীর নিউ মার্কেট, মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজার ও এতিমখানা রোড কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। বাজারে কিছু পণ্যের দাম সামান্য কমলেও সার্বিকভাবে উচ্চমূল্যের চাপ থেকে স্বস্তি মিলছে না ক্রেতাদের। ফলে একই আয় দিয়ে আগের মতো বাজার করা তো দূরের কথা, সংসারের প্রয়োজন মেটাতেই প্রতিনিয়ত কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাদের।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে এক হাতে বাজারের ফর্দ, অন্য হাতে ছোট একটি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর আহমেদ। চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ। বলছিলেন, ‘গত সপ্তাহেও আড়াই হাজার টাকা নিয়ে বাজারে এসে অন্তত পুরো সপ্তাহের একটা কাটছাঁট বাজার করতে পেরেছিলাম। আজ ঠিক একই টাকা পকেটে নিয়ে এসেছি, কিন্তু ব্যাগটা অর্ধেকও ভরেনি। টমেটোর গায়ে হাত দেওয়া যায় না, বেগুনের দাম শুনে চমকে উঠতে হয়।’
চাল-ডাল আর মসলার বাজারে ঢুকলে তো রক্তচাপ বেড়ে যায়— এমন মন্তব্য করে তার অভিযোগ, ‘জিরা কেজিপ্রতি ৬০০ আর এলাচ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। সামান্য মসলা কিনতেই যদি পকেট খালি হয়ে যায়, তাহলে বাকি বাজার করব কী দিয়ে? বাচ্চাদের জন্য একটা ফল কেনার মতো বাড়তি ৫০ টাকাও পকেটে থাকে না।’
সবজির বাজারে অস্বস্তি: চলতি সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি সবজির দামে। গত সপ্তাহে ৯০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া টমেটো এখন ১২০-১৩০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৩০ টাকা।
বেড়েছে গোল ও লম্বা বেগুনের দামও। গত সপ্তাহে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এ সপ্তাহে তা বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়। কাঁচামরিচের দাম অবশ্য কিছুটা কমে নেমেছে ১৪০ টাকায়।
পটোলের দাম গত সপ্তাহের ৬০ টাকা থেকে কমে এসেছে ৫০ টাকায়। তবে এতে বাজারে স্বস্তি ফিরছে না ক্রেতাদের। আলু বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা কেজি দরে। দেশি পেঁয়াজের দামও গত সপ্তাহের মতোই রয়েছে ৫০-৬০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
মসলা-তেলেও নেই স্বস্তি: শুধু সবজিতে নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও চাপ বাড়াচ্ছে মধ্যবিত্তের বাজেটে। মসুর ডাল ১৪৫ এবং মুগ ডাল ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। জিরার দাম ৬০০ টাকা কেজি। আর এলাচের দাম পৌঁছেছে ৪ হাজার ৫০০ টাকায়।
বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী রহিমা বেগমও জানালেন একই আক্ষেপের কথা। তার ভাষ্য, মধ্যবিত্তদের এখন কাটছাঁটের জীবন। মসুর ডাল ১৪৫ আর মুগ ডাল ১৫০ টাকা কেজি। যে তরকারি আগে একটু ঘন ডাল আর মসলা দিয়ে রান্না করা যেত, এখন সেখানে কমিয়ে দিতে হচ্ছে সবকিছু। বাজারের আগুন এসে পৌঁছেছে তাদের থালা পর্যন্ত।
সয়াবিন তেলের দামও রয়েছে ২০০ টাকার কোঠায়। চাল, ডাল, চিনি ও গরম মসলার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবারকে ছোট করতে হচ্ছে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা।
বাড়তি দামের দায় কার?: বিক্রেতাদের কণ্ঠে আবার ধরা পড়ল ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা ও অসহায়ত্ব। নিউ মার্কেটের প্রবীণ সবজি বিক্রেতা আবুল কাশেম বলছিলেন, ‘ক্রেতারা আমাদের ওপর রাগ করেন, ভাবেন আমরা পকেট কাটছি। কিন্তু গত সপ্তাহে আড়ত থেকে যে টমেটো ৮০ টাকায় এনে ৯৫ টাকায় বিক্রি করেছি, এ সপ্তাহে বৃষ্টির অজুহাতে আড়তদাররা সেটাই ১১৫ টাকার নিচে দিচ্ছেন না। আমরা সামান্য লাভ রেখে বিক্রি করতে গেলেও দাম ১৩০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।’
এতিমখানা রোডের ব্যবসায়ী শফিক মিয়াও জানালেন একই ধরনের সমস্যার কথা। ‘মোকাম ও মিলপর্যায় থেকে যদি মূল্যের কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে খুচরা বাজারে আমাদেরও তেমন কিছু করার থাকে না। পরিবহন খরচও কমেনি। সব মিলিয়ে দর ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছি।’ ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই টানাপড়েনে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপরই। আয় যেখানে নির্দিষ্ট, সেখানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সংসারের প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করছেন মধ্যবিত্তরা। কারও রান্নায় কমছে মসলা, কারও বাজার থেকে বাদ পড়ছে টমেটো-ফলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল পণ্য।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও পাইকারি বাজারের ওপর কার্যকর নজরদারি না বাড়ালে কঠিন হবে এই উচ্চমূল্যের চাপ কমানো। আর সে চাপ যত বাড়বে, ততই কমবে নির্দিষ্ট আয়ে চলা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।





