রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার আছে নভেম্বর পর্যন্ত, তারপর?

সংগৃহীত ছবি
আর মাত্র কয়েক মাসের নিশ্চয়তা। যে অর্থ এখন হাতে আছে, তা দিয়ে কক্সবাজারের শিবির ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যসহায়তা চালিয়ে নেওয়া যাবে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর কী হবে, তার উত্তর নেই। নতুন অর্থায়ন না এলে আবারও খাবারের টানে পড়তে পারে যুদ্ধ, নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা।
এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই আজ ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ৯ বছর পূর্ণ হলো। শুরু হচ্ছে সংকটের দশম বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে প্রত্যাবাসনের পথ যেমন খোলেনি, তেমনি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে তাদের ন্যূনতম জীবনধারণের ব্যবস্থাও। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা— সবক্ষেত্রেই অর্থের টান। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু প্রত্যাবাসনের অচলাবস্থায় আটকে নেই; সামনে দেখা দিয়েছে শিবিরে মানবিক সেবা টিকিয়ে রাখার নতুন সংকট।
২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার চেয়েছে জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় এবার আবেদনের পরিমাণ ২৬ শতাংশ কম। তবে মানুষের প্রয়োজন কমেনি। অর্থ সংকটের বাস্তবতায় পরিকল্পনাটিই ছোট করতে হয়েছে; সীমিত করা হয়েছে জীবনরক্ষাকারী ন্যূনতম সেবাও। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান আগামীর সময়কে বলেছেন, এ বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার প্রায় ৬৬ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে। বছরের বাকি সময়ের জন্য এখনো বড় অঙ্কের অর্থঘাটতি রয়েছে। শারির ভাষায়, অর্থ সংকটের কারণে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তাসহ জরুরি সেবাগুলো ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সংকট দীর্ঘ হলে অপুষ্টি, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, মানব পাচার এবং বর্ষাজনিত প্রাণহানির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
নভেম্বর পর্যন্ত খাবার, তারপর?: বছরের শুরুতেই সবচেয়ে বড় শঙ্কা ছিল রোহিঙ্গাদের খাবার নিয়ে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচিতে তখন প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের ঘাটতি ছিল। নতুন অর্থ না এলে এপ্রিল থেকেই খাদ্যসহায়তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
পরে নতুন অনুদান পাওয়ায় আপাতত সে শঙ্কা কিছুটা কেটেছে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যসহায়তা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি। কক্সবাজার ও ভাসানচরের পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সহায়তা পুনর্বিন্যাসও করা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশি সহায়তা পাচ্ছে।
খাবারের বাইরে আরও বড় সংকট: খাবারের ব্যবস্থা কোনোভাবে নভেম্বর পর্যন্ত চললেও শিবিরের অন্য জরুরি সেবাগুলোও চাপের মুখে রয়েছে। আশ্রয়, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যবিধি, শিক্ষা ও সুরক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাহিদা আছে।
শারি নিজমান বলছিলেন, অর্থ সংকটের কারণে শিক্ষা, জীবিকা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে থাকা একটি প্রজন্মের জন্য এসব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের এ বছরের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় প্রয়োজন ১০ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। জুনের প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, তখন তাদের মোট অর্থায়ন ঘাটতি ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ডলার। পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতে ঘাটতি ১ কোটি ৯ লাখ ডলার এবং শিশু সুরক্ষা খাতে ৭০ লাখ ডলার।






