এবার এলএনজি সংকটে কমেছে গ্যাস সরবরাহ

দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহে সংকট যেন পিছু ছাড়ছেই না। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির পর এবার এলো এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় খবর। যার জেরে আরও কমেছে গ্যাস সরবরাহ। এতে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানায় আগের চেয়েও বেড়েছে গ্যাসসংকট। পরিস্থিতি এভাবে থাকলে সামনের দিনগুলোয় সংকট আরও বাড়বে।
তবে গরম কিছুটা কমায় চাহিদা কমেছে, ফলে কমেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। গ্যাস-বিদ্যুতের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে কাতার যাচ্ছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একটি সূত্র বলছে, এই সফরে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সে পথেও পড়েছে বাধা। এতে খোলাবাজার থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে আর্থিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সময়মতো এলএনজি মিলছেও না।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট, যেখান থেকে পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির পুরোপুরি মেরামত কাজ শেষ হলেও এলএনজি কার্গো না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ। বর্তমানে ৬০ কোটি ঘনফুটের জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১০-১২ কোটি ঘনফুটের মধ্যে। এটি দেওয়া হচ্ছে মজুদ এলএনজি থেকে। হিসাব বলছে, আগামীকাল বুধবার এই মজুদও শেষ হয়ে যাবে। তখন গ্যাসসংকট আরও বাড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে চলতি
মাসে দরপত্র ছাড়াই ডিপিএম (সরাসরি ক্রয়) পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে ছয় কার্গো
এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়— যার মধ্যে গতকাল একটি কার্গো আসার কথা থাকলেও
তা আসেনি। আগামীকাল যে কার্গোটি আসার কথা ছিল তাও আসছে না। ফলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল
থেকে পুরোপুরি সরবরাহ যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী
রবি ও সোমবারের মধ্যে আরেকটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। তবে সেটি নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এ অবস্থায় গত রবিবার নতুন করে পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করে
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। তাতে ২৩, ২৬, ২৯ আগস্ট
এবং ১ ও ৪ সেপ্টেম্বরে এলএনজি সরবরাহ দেওয়ার কথা বলা হয়।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সূত্রমতে, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এখন সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২২০-২২৫ কোটি ঘনফুটের মধ্যে। গত শনিবারও সরবরাহ করা হয়েছিল প্রায় ২৪৩ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সরবরাহ ক্রমেই কমছে। সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন অন্তত ১৫০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি রয়েছে। যদিও বাস্তবে গ্যাসের চাহিদা আরও বেশি।
বর্তমানে দেশের কূপগুলো থেকে কমবেশি ১৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৬০-৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকে কমবেশি ৫০ কোটি ঘনফুট এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনাল থেকে ১০-১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। যদিও টার্মিনাল দুটির মোট সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট।
অন্যদিকে সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকোর কার্গো আল-হামরা
থেকে এলএনজি খালাস করতে এক্সিলারেটকে অনুরোধ করেছে পেট্রোবাংলা। এ ব্যাপারে এক্সিলারেটের
মনোভাব কিছুটা ইতিবাচক বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর আগে গত সপ্তাহে আরামকোর কার্গোটি পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে সামিটের টার্মিনালের
অপারেটর এক্সিলারেট তাতে আপত্তি জানায়। বহির্নোঙরে তিন দিন অপেক্ষার পরও কার্গোটি
টার্মিনালে যুক্ত হতে না পারায় বৃহস্পতিবার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে ২০০ কোটি ঘনফুটের
নিচে নামে। তার আগে সেখান থেকে কমে যায় গ্যাস সরবরাহ।
পরে জরুরি ভিত্তিতে বিটল কোম্পানির একটি কার্গোকে নির্ধারিত সময়ের আগে আসার অনুরোধ
জানানো হয় এবং সেটি শুক্রবার সংযুক্ত করার পর কিছুটা উন্নতি হয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি।
ওইদিন রাতে আরামকোর জাহাজটিকে চলে যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হলেও পরে খোলাবাজার থেকে কেনা
জেন হু কোম্পানির কার্গো অনিশ্চিত হওয়ায় ফের আটকে দেওয়া হয় আরামকোর কার্গো। এখন সেই
কার্গো থেকেই এলএনজি সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে গতকাল বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান এবং আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী কাতার সফরে যাচ্ছেন মূলত এলএনজি সরবরাহ কীভাবে স্বাভাবিক করা যায় সেজন্য। তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত এলএনজির বিষয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।’
উদ্বিগ্ন শিল্পোদ্যোক্তারা: গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি
টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে কমে যায় দৈনিক ৫৫-৬০ কোটি ঘনফুট
গ্যাস সরবরাহ। ১৫ দিন পর টার্মিনালটি আংশিক সচল হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। গত বৃহস্পতিবার
সামিটের একটি টার্মিনালে এলএনজি কার্গো নিয়ে টানাপড়েনের কারণে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ
পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে সরবরাহ ১৯২ কোটি ঘনফুটে নামে। গত শুক্রবার সামিটের
এলএনজি টার্মিনাল থেকে ফের গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে কারখানায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। তবে
এখনো অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারেনি।
এর মধ্যে রবিবার থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় কারখানার মালিকরা উদ্বেগে পড়েছেন।
অনেক কারখানাতেই গ্যাস মিলছে না। আবার কোথাও কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ এতটাই কম যে, তা
নিয়ে কারখানা সচল রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লোডশেডিং কমেছে: চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিং আগের চেয়ে কমেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৭৬ মেগাওয়াট। আর লোডশেডিং হয়েছে ৮৯৩ মেগাওয়াট। আগের দিন রবিবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪০ মেগাওয়াট। বিপরীতে ১৪ হাজার ৭৪৮ মেগাওয়াট সরবরাহ করায় ১৫৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে গড়ে লোডশেডিং ছিল আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট। গত ১০ আগস্ট রেকর্ড ৩৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়, আর চাহিদা ছাড়িয়ে যায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট।






