সড়কে নিয়ম ফিরলেও অটোরিকশায় হোঁচট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা দোলাইরপাড়। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়া ও আসার প্রধান পথ এটি। দোলাইরপাড় চৌরাস্তার উত্তরে যাত্রাবাড়ী, পশ্চিমে মীর হাজীরবাগ, পূর্বে দনিয়া ও দক্ষিণে জুরাইন-পোস্তগোলা এলাকা। চৌরাস্তার একটি অংশে ডাইভারশন থাকায় পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে যেতে দক্ষিণের রাস্তা ঘুরে আসতে হয়। কিন্তু তা না করে অটোরিকশাগুলো উল্টোপথে যাতায়াত করছে, এর সঙ্গে রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল। ফলে এই স্থানে সঠিক পথে আসা অনেক যানবাহনের চালক ক্ষণিকের জন্য হলেও সম্বিৎ হারাতে পারেন। এসব কারণে প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয় এই চৌরাস্তায়।
শুধু দোলাইরপাড়ই নয়, এমন চিত্র ঢাকা শহরের প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত ট্রাফিক পয়েন্টে। তবে ভিন্ন রূপ দেখা গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে।
এসব পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে সিগন্যাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টোপথে চলাচল, জেব্রাক্রসিং দখল, সিটবেল্ট না পরা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো ও অবৈধ পার্কিংয়ের মতো নানা অপরাধ। এআইর নজরদারিতে রাজধানীতে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি মামলার ভয়ে চালকরা চলতে শুরু করেছেন শৃঙ্খলায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদার হওয়ায় সড়কে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরলেও বারবার পুলিশ হোঁচট খাচ্ছে অটোরিকশার কারণে।
তিন চাকার এই ছোট্ট যানটি গলিপথ ছেড়ে এখন রাজধানীর প্রধান সড়কে হাওয়ার বেগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে দুর্ঘটনার। দ্রুতগতিতে মোড় নেওয়া, হঠাৎ ব্রেক এবং আইনের তোয়াক্কা না করায় সড়কে এখন আতঙ্কের নাম অটোরিকশা। এআই মামলার ভয়ে অন্যান্য যানবাহন আইন মানার চেষ্টা করলেও নম্বর প্লেট না থাকার সুযোগে অটোরিকশাগুলো উল্টোপথে চলাচল এবং সিগন্যাল অমান্য করার মতো অপরাধ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পুরো ব্যবস্থাকেই কার্যত প্রশ্নের মুখে ফেলছে অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত চলাচল।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সোনারগাঁও হোটেল, বাংলামোটর, বিজয় সরণি মোড়, জাহাঙ্গীর গেটসহ মোট ৩০টি ক্রসিং পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক এআই ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা। সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে গাড়ি চালানোসহ ছয়টি আইন ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মামলার কাগজ ফোনে চলে যাচ্ছে গাড়ির মালিকের কাছে।
গত কয়েকদিন নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, এআই মামলার ভয়ে অন্যান্য যানবাহন যেখানে ট্রাফিক আইন মেনে চলার চেষ্টা করছে, সেখানে অটোরিকশাগুলো চলছে সম্পূর্ণ বেপরোয়া গতিতে। সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, দ্রুতগতিতে প্রধান সড়কে চলাচল— সব অনিয়মই নিয়মে রেখেছে অটোরিকশা চালকরা। কারণ, এআই ক্যামেরা তাদের শনাক্ত করতে পারছে না, হচ্ছে না কোনো স্বয়ংক্রিয় মামলাও।
রাজধানীর গুলশান-বনানী, বাংলামোটর, পান্থপথ, পল্টন, গুলিস্তান, মগবাজার, আগারগাঁও, মিরপুর, পল্লবীসহ নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উল্টোপথে অটোরিকশা চলতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অটোরিকশার গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি। এতে ঝুঁকি বাড়ছে দুর্ঘটনার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক পরিদর্শক তারিকুল আলম জানিয়েছেন, ক্যামেরা বসানোর পরও রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়লেও নিবন্ধন না থাকায় মামলা দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, রিকশা সিগন্যাল মানছে না। আগে আগে চলে যাচ্ছে। গাড়ির আগে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। এগুলোর সমাধান না করা গেলে এআই ব্যবহারের কার্যকর ফল আসবে না।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সফটওয়্যারে ছয় ধরনের আইন অমান্য-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব আইন অমান্য করা যানবাহন শনাক্ত করে নাম্বার প্লেটসহ ছবি তুলে রাখছে এআই ক্যামেরা। সেসব ছবি-ভিডিও ডিএমপি সদর দপ্তরের ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে জমা হচ্ছে। সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভার। ফলে সহজেই আইন অমান্যকারী যানবাহনের নম্বর দিয়েই পাওয়া যাচ্ছে মালিকের বিস্তারিত তথ্য। সার্ভারে জমা হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মালিকের নামে দেওয়া হচ্ছে মামলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধনহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। আর সারা দেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশার দাপট তো আছেই।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেছেন, ‘যেসব সড়কে ডিজিটাল সিগন্যাল, এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে; সরকারের উচিত এসব জায়গায় অটোরিকশার মতো অবৈধ যানবাহন নিষিদ্ধ করা। পাশাপাশি লক্কড়ঝক্কড় বাস; এগুলোর ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেছেন, যেসব যানবাহনে নম্বর প্লেট নেই, সেসব বাহনকে এআই শনাক্ত করতে পারে না। তবে সব ধরনের যানবাহনকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। নিবন্ধন নেই অথবা অস্পষ্ট নম্বর প্লেটযুক্ত যানবাহনের বিরুদ্ধে পবিত্র ঈদুল আজহার পর বড় ধরনের অভিযান শুরু হবে।






