নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন
ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন জটিলতায় চীনের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ

শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত নদীতীরের দিকে তাকিয়ে আছেন এক ব্যক্তি
ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর আলোচনার পরও ঝুলে আছে তিস্তা চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। পানি সংকট মোকাবিলায় এবার নিজস্ব প্রকল্প ও চীনের সহযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। খরা, লবণাক্ততা ও নদীর পানি কমে যাওয়ার সমস্যা সামাল দিতে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকট ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য ভারতের উজানে নির্মিত বাঁধগুলোকে দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। বিশেষ করে প্রায় ৫০ বছর আগে নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে তিস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানিবণ্টন চুক্তিও।
ঢাকাভিত্তিক রিভার্স অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুকিয়ে গেছে বা দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশে অন্তত ৭৯টি নদী। সংস্থাটির মতে, উজানে পানি প্রত্যাহার ও অতিরিক্ত পলি জমার কারণে শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীর অনেকগুলো আংশিক বা পুরোপুরি শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হুমকির মুখে পড়ছে জীবিকা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য।
এ পরিস্থিতিতে গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকার ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ এবং সংশোধিত তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়।
পদ্মা ব্যারাজের লক্ষ্য হলো বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট ও লবণাক্ততা মোকাবিলা করা। অন্যদিকে, চীন-সমর্থিত তিস্তা মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্য নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ভূমি পুনরুদ্ধার, নদীভাঙন রোধ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে গঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে গড় পানিপ্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। ১৯৭৫ সালের পর তা অনেক সময় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার কিউসেকের মধ্যে নেমে আসে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০১১ সালে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে। নতুন করে চুক্তি নবায়নের আলোচনা চললেও বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে তিস্তা ইস্যু। এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এর ফলে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্ভাবনাও কমে গেছে অনেকটা।
নয়াদিল্লি ভিত্তিক মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের সিনিয়র ফেলো ও আন্তঃসীমান্ত নদী বিশেষজ্ঞ উত্তম কুমার সিনহার মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা কৌশলগত বার্তা বহন করছে ভারতের জন্য।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বাংলাদেশ বিকল্প অংশীদারের দিকে ঝুঁকেছে।
তিস্তা প্রকল্পের অবস্থান ভারতের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ এটি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেনস নেকের কাছাকাছি, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল যোগাযোগপথ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, বছরের পর বছর তিস্তা প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না বাংলাদেশ। তার মতে, এটিকে নিরাপত্তা নয়, উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তবে প্রকল্প দুটিকে ঘিরে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজকে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন। সংগঠনটির মতে, এটি দেশের বদ্বীপভিত্তিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি করতে পারে এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিও দুর্বল করতে পারে। মধ্যাঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাস, পলি জমা ও বন্যার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে তারা।
তিস্তা প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে পরিবেশবাদীদের। তাদের মতে, প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতির মূল সমস্যার সমাধান করবে না।
কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেছেন, কোনো ব্যারাজ নিজে পানি তৈরি করতে পারে না। শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে কতটুকু পানি আসবে, তা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না পদ্মা ব্যারাজ।
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে গত ২০ মে কলকাতায় বাংলাদেশ ও ভারতের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের চার দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বৈঠক শেষে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
উত্তম কুমার সিনহার মতে, ভবিষ্যতের চুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি বণ্টনের পরিবর্তে বাস্তব সময়ের পানিপ্রবাহ মূল্যায়ন, নিয়মিত পর্যালোচনা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
তার ধারণা, নতুন চুক্তি মেয়াদে তুলনামূলক স্বল্প এবং কাঠামোগতভাবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতিতে সক্রিয়তা বৃদ্ধি সত্ত্বেও উজানের রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য থেকে যাবে। পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না হলে দেশের নদী সংকটের টেকসই সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।







