পাখির জন্য আহম্মদ উল্ল্যাহ

গাছে মাটির কলস বাঁধছেন আহম্মদ উল্ল্যাহ - আগামীর সময়
গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে গাছে গাছে ঝুলছে কলস। অবাক করার মতো দৃশ্যই বটে। তবে একটু খেয়াল করে দেখলে উত্তর পাওয়া যাবে সব কৌতূহলের। তখন দেখা যাবে, নানা আকারের সব পাখি কলসের কানায় বসে হুটোপুটি করছে। কেউ কেউ ঢুকে যাচ্ছে কলসের ভেতর, একটু পর আবার ফুড়ুত করে উড়েও যাচ্ছে।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের চৌধুরীপাড়ায় গেলে দেখা মিলবে এ চমৎকার দৃশ্যের। যেখানে সারি সারি কলস ঝুলিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাখির জন্য নিরাপদ আবাস। আর এই অনন্য আয়োজনের যিনি উদ্যোক্তা, তিনি হলেন আহম্মদ উল্ল্যাহ। পেশায় গাইবান্ধা জেলা সদরের নতুন বন্দর বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভি শিক্ষক।
আহম্মদ উল্ল্যাহ শুধু পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়েই ক্ষান্ত হননি, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির জীবন বাঁচাতে গ্রামে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সমর্থও হয়েছেন। পাশাপাশি পাখিদের কল্যাণে চলছে তার নানা কর্মকাণ্ড। প্রশ্ন ছিল, কেন আর কোন ভাবনা থেকে এই উদ্যোগ নিলেন তিনি? জবাবে আহম্মদ উল্ল্যাহ ফিরে গেলেন ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। সে বছর জাঁকিয়ে শীত পড়েছিল। তিনি তখন উপজেলার তালুককানুপুর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর দেখলেন, ঘরের চালা, গাছের ডালে পাখি আর পাখি। তাদের মধ্যে কিছু পাখি গাছে বাসা বাঁধা নিয়ে ঝগড়া করছিল। সন্ধ্যায় ঘরের চালায় সাধারণত পাখিরা বসে না। আর এক গাছে এত পাখিও দেখা যায় না। তাহলে সেদিন কোথা থেকে এলো এত পাখি? ব্যাপারটি কৌতূহলী করে তাকে। একপর্যায়ে আহম্মদ উল্ল্যাহ বুঝতে পারলেন বিষয়টি। আর সেটি হলো, দিনের পর দিন কমে আসছে গাছ। এজন্য আশ্রয়ও হারাচ্ছে পাখি। তাই এক গাছে এত পাখির ভিড়, গাছে বাসা বাঁধা নিয়ে ওদের ঝগড়া। নীড়হারা পাখির কষ্ট নাড়া দেয় তার কিশোর মনে। ওদের জন্য কিছু করার একটা তাগিদ অনুভব করেন তিনি।
আহম্মদ উল্ল্যাহ শুরুতেই বাড়ির তিনটি গাছে পাখির আশ্রয় হিসেবে কলস বেঁধে দেন। দেখা গেল, ঝড়বৃষ্টির সময় একসঙ্গে বেশ কিছু পাখি আশ্রয় নিচ্ছে। তিনি এতে বেশ উৎসাহ পান। পাখির এই আশ্রয় নেওয়া দেখে এবার গ্রামের বিভিন্ন গাছে কলস বাঁধতে শুরু করেন। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে গাছে কলস বাঁধতেন তিনি। একেকটি কলস তখন পাঁচ টাকা করে কিনতেন। প্রথম বছর বিভিন্ন গাছে ১৪০টি কলস বাঁধেন। এখন তা এক হাজারে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি উত্তরপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় সব গাছেই ঝুলছে মাঝারি আকৃতির কলস। প্রতিটি কলস একটু কাত করে বাঁধা। পাখিরা খড়কুটো সংগ্রহ করে এসব কলসের ভেতর বাসা বেঁধেছে। এই পাখিদের মধ্যে রয়েছে দোয়েল, শালিক, হুতুমপেঁচা ও টিয়া।
বাসা সংরক্ষণ
আহম্মদ উল্ল্যাহ শুধু গাছে কলস বেঁধেই বসে থাকেননি— পাখিদের এই আশ্রয় সংরক্ষণে যা করার সবই করতেন। কলসের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে সব কলস নজর রাখা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তখন তিনি এ দায়িত্ব অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা ভাবেন। সেই ভাবনা থেকেই ২০০৭ সালে গ্রামে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘উত্তরপাড়া শান্তি সংঘ’। ৪০ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি আহম্মদ উল্ল্যাহ। সমিতির সদস্যরা কলসের ভেতরে পাখির আশ্রয় দেখভাল করতেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল্লাহ বলছিলেন, রাস্তার পাশে ও বাড়ির আনাচে-কানাচে থাকা গাছগুলোয় বাঁধা কলস ঢিল ছুড়ে শিশুরা যাতে নষ্ট না করতে পারে, সে বিষয়ে নজর রাখেন সমিতির সদস্যরা। কোনো কারণে কলস ভেঙে গেলে সেখানে নতুন কলস দেওয়া হয়। পাখিরা যাতে সহজে খাবার সংগ্রহ করতে পারে, সেজন্য আহম্মদ উল্ল্যাহর উদ্যোগে ২০০৭ সাল থেকে পাখির বাসাসংলগ্ন এলাকার ফসলি জমিতে বাঁশের কঞ্চি পোঁতা হয়। সেই কঞ্চিতে বসে পাখিরা ক্ষেতের পোকামাকড় খেতে পারে। এতে জমিতে কীটনাশকের ব্যবহারও কমে গেছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ একর জমিতে বাঁশের কঞ্চি লাগানো হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক জাফিরুল ইসলাম বলছিলেন, কঞ্চি পোঁতার উপকারিতার কথা। তিনি জানালেন, প্রতি বছর কীটনাশক ছিটিয়ে ধানের পোকামাকড় দমন করতে হতো। আহম্মদ উল্ল্যাহ তার প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে বাঁশের কঞ্চি লাগিয়েছেন। এতে এবার জমিতে কীটনাশক ছিটাতে হয়নি।
স্বীকৃতি ২০১০-২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরে পাখির প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে দুটি পুরস্কার, দুটি পদক ও দুটি সনদ পেয়েছেন। তাকে পুরস্কার দিয়েছে জিইউকে ও ইয়ুথ। পদক পেয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর ও জাতীয় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও। আর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছেন পরিবেশ সংরক্ষণ সনদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সনদ।
আহম্মদ উল্ল্যাহ বলেছেন, ‘শখ করে পাখি সংরক্ষণ শুরু করেছিলাম, এখন তা নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রথমে মানুষ আমাকে পাগল বলত। এখন সবাই সহযোগিতা করে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম জেলা জুড়ে ছড়িয়ে দিতে চাই। তবে এজন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ বলছিলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে পাখির ভূমিকার কথা। তিনি বললেন, সেই পাখি সংরক্ষণে আহম্মদ উল্ল্যাহর অবদান অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।




