বিদেশে কর্মী পাঠাতে ‘আস্থার সংকট’ কাটাতে চায় সরকার
- আওয়ামী আমলে শ্রমবাজারে পড়ে নেতিবাচক প্রভাব
- রপ্তানি বাড়াতে সংকট নিরসনে ব্যস্ত সরকার
- মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের শ্রমবাজার বন্ধ
- মধ্যপ্রাচ্যে সুযোগ কমেছে ইরান যুদ্ধের কারণে
- বাংলাদেশ অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয় প্রবাসী আয়কে। প্রায় দেড় কোটি রেমিট্যান্স যোদ্ধার অবদানে সমৃদ্ধ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, চালু থাকছে আমদানি বাণিজ্য। অনেকাংশে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণ করে এই খাত। কিন্তু ক্রমেই কমে যাচ্ছে বিদেশে শ্রম রপ্তানি। আওয়ামী আমলে কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণা, সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনসহ বিভিন্ন কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই বাজারে। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য বন্ধ বাহরাইন ও মালয়েশিয়ার বাজার। আর এসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ক্ষমতার মেয়াদের পাঁচ বছরে প্রবাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিলেও আস্থা সংকট কাটাতেই ব্যস্ত পাঁচ মাস।
বিদেশে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি প্রতারণা ও নৈরাজ্য বন্ধসহ নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবাসীদের জন্য একগুচ্ছ কর্মসূচি নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মসনদে বসে বিএনপি সরকার। কিন্তু ওই মাসের ২৮ তারিখে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর ছড়িয়ে পড়ে সংঘাত। প্রতিশোধ নিতে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তেহরান। এতে ওই সব স্থাপনার ক্ষতির পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠান, ছোট হয়ে এসেছে প্রবাসীদের কাজের ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের প্রবাসী আয় মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক শুধু এ অঞ্চলেই কাজ করেন। কিন্তু সেখানে চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১২ বাংলাদেশিসহ কয়েক ডজন প্রবাসী। এমতাবস্থায় মৃত্যুর ভয়ে কাজে যেতে পারছেন না অনেক শ্রমিক। আবার আক্রান্ত হওয়ায় বন্ধ কিছু প্রতিষ্ঠান। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানিতে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩ লাখ ৫ হাজার কর্মী গেছেন বিদেশে। ওই বছরের তুলনায় বিদেশে কর্মসংস্থান আর বাড়ছে না। গত বছর বিদেশে কাজ নিয়ে গেছেন ১১ লাখ ৩২ হাজার কর্মী। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব গেছেন ৭ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৪ জন। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর কর্মী যাওয়া কমে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে।
‘এ বছর জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিদেশে জনশক্তি পাঠানো হয়েছে
৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৬৭ জন। এর মধ্যে সৌদি গেছেন ২ লাখ ১৪ হাজার বাংলাদেশি। অথচ গত বছর
ঠিক একই সময়ে বিদেশে যান ৫ লাখ ১৩ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু সৌদি গেছেন ৩ লাখ ৬৫
হাজার কর্মী। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর এই সময়ে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩০ শতাংশ। আর
শুধু সৌদির বাজারে বাংলাদেশি প্রবেশ কমেছে এক-তৃতীয়াংশ’— তথ্য দিল বিএমইটি।
সরকারের উদ্যোগ: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বিদেশে শ্রম রপ্তানি বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন সরকারের পাঁচ মাসে কর্মসংস্থান বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বিস্তর কর্মপরিকল্পনা। উন্নত করা হয়েছে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর সেবা কার্যক্রম। ঊর্ধ্বমুখী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা। এমনকি শ্রমবাজার বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া সফর করে সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের এই পাঁচ মাসে বিদেশে শ্রম রপ্তানির চিত্র জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুুরুল হকের জবাব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কারণে শৃঙ্খলা না থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। প্রতারণার কারণে তৈরি হয়েছে আস্থাসংকট। সেই সংকট কাটানোর চেষ্টায় আছে সরকার।
‘মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। এতে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি দেখা দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা। এ ছাড়া শ্রমবাজার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এশিয়া, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল কিংবা ইউরোপেও নজর দেওয়া হচ্ছে। আফ্রিকায়ও সম্ভাবনা খুঁজছে সরকার’— আগামীর সময়কে জানালেন তিনি।
বাজারে নৈরাজ্য কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে— এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করলেন, বিগত দিনে যারা সিন্ডিকেট করেছে, তাদের ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতারণা কমানোর পাশাপাশি বাজার উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কর্মীদের। বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ‘গলাকাটা’ অভিবাসন ব্যয়ও; এজন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
প্রবাসী কল্যাণ কর্মকর্তাদের মতে, বাহরাইনে একটি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের জন্য দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ। সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেখানে সফর করেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বাজারটি আবার চালুর বিষয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকারও।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১৮ মে ঢাকায় বাংলাদেশ-কাতার সপ্তম যৌথ কমিটির সভায় বিদ্যমান খাতের পাশাপাশি নতুন আরও চারটি খাতে কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির শ্রমমন্ত্রী আলী বিন সামিখ আল মাররি। এ ছাড়া মৌসুমি কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে সরকার।
পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জাপানকে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাপান সেল করার অনুমতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাপানি ভাষা শিখে উচ্চ বেতনে চাকরি পাচ্ছে নেপালসহ অনেক দেশ। কিন্তু বাংলাদেশ পিছিয়ে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিদেশি ভাষা শিখলে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১০ লাখ টাকা ঋণের ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন-২০২৬ অনুসারে, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ অষ্টম দেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা বৈধ পথে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন (প্রায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা), যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
এ আয় আরও বাড়াতে নানা পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞরা। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক ও সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম রেজার আক্ষেপ, ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসছে। কিন্তু আমরা প্রতিদিনই খবর পাচ্ছি, বহু কর্মী ঘরবন্দি, বেতন পাচ্ছেন না ঠিকমতো। এই ঝুঁকি থেকে নতুন করে কোন বাজারে যাওয়া যায় বা মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প বাজার আমাদের জন্য কী হতে পারে— এগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা শুনছি না।’
‘শ্রমিকদের হয়রানি ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে সিন্ডিকেট ও এজেন্সির দৌরাত্ম্য। এখনো শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে দুষ্টু চক্র। তাই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে গ্রেডিং করে আনতে হবে জবাবদিহির আওতায়’— পরামর্শ দিলেন তিনি।




