বঙ্গভবনের দরজা পেরিয়ে ‘অনিশ্চিত যাত্রায়’ সাহাবুদ্দিন

ফাইল ছবি
বঙ্গভবনের বিশাল ফটক পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির গাড়িবহর যখন শেষবারের মতো বের হবে, তখন শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নয়— শেষ হবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়েরও। কয়েক বছর আগেও যিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে, আজ তিনি আর সেই সাংবিধানিক সুরক্ষার ছাতার নিচে নেই। সামনে অপেক্ষা করছে একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা— যেখানে আছে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই, ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা, আবার থাকছে আইনের মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্নও।
গতকাল শুক্রবার গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু সাংবিধানিক এই আনুষ্ঠানিকতার পরই শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা— এখন কী করবেন সাহাবুদ্দিন?
এখন প্রথম যে পরিবর্তনটি ঘটবে, সেটি হলো তার সাংবিধানিক অবস্থানে। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট দায়মুক্তি ভোগ করেন। এর উদ্দেশ্য, রাষ্ট্রপ্রধানকে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু সেই সুরক্ষা পদের সঙ্গে যুক্ত, ব্যক্তির সঙ্গে নয়। ফলে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তিনি অন্য যেকোনো নাগরিকের মতোই দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় চলে আসবেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে, তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কোনো মামলা হবে বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার এটাও নয় যে, ভবিষ্যতে অভিযোগ উঠলেও তাকে স্পর্শ করা যাবে না। যদি তার দায়িত্ব পালনকালীন কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ ওঠে, তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়, কিংবা আদালত কোনো নির্দেশ দেন— তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়া চলতে পারবে।
অবশ্য এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা, তদন্ত বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো— তিনি কি জনজীবনে সক্রিয় থাকবেন, নাকি নীরব অবসরে চলে যাবেন?
বাংলাদেশের ইতিহাসে অধিকাংশ সাবেক রাষ্ট্রপতিই দায়িত্ব ছাড়ার পর ধীরে ধীরে জনপরিসর থেকে দূরে সরে গেছেন। কেউ স্মৃতিকথা লিখেছেন, কেউ সীমিত পরিসরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ প্রায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন বেছে নিয়েছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রেও তেমন একটি পথই বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তার স্বাস্থ্যও এখন বড় একটি বিবেচ্য বিষয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডন ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে সেই অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষা করাতেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। গত ১২ মে কেমব্রিজের রয়্যাল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সেসময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ হিসেবে গুরুতর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে চিকিৎসাই তার প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। প্রয়োজনে দেশে কিংবা বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও তার সামনে খোলা থাকবে। আইনগতভাবে বিদেশ ভ্রমণে স্বয়ংক্রিয় কোনো বাধা নেই। যদিও ভবিষ্যতে আদালতের নির্দেশে ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা জারি হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত রাজনৈতিক নয়, আইনি। কারণ রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর তার প্রতিটি পদক্ষেপ আর শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের নয়; একজন সাধারণ নাগরিকের পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ, তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে সেটিই তার পরবর্তী অধ্যায়ের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
আবার যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তাহলে দীর্ঘ কর্মজীবনের পর তিনি হয়তো নীরব অবসরেই ফিরে যাবেন। বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রপতি— বহু পরিচয়ের পর শেষ পরিচয়টি হতে পারে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির, যিনি আলোচিত এক রাজনৈতিক সময়ের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবেন।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় অকল্পনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে।
এরপর হাসিনা আমলের কিছুই অবশিষ্ট রাখা হয়নি। কিন্তু অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তিনিই সংসদ বিলুপ্তির আদেশ দিয়েছেন, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়িয়েছেন। ওই সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। সর্বশেষ তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারেরও শপথ পড়িয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তাকে ঘিরে বিতর্কের শুরু। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অবস্থান নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে। একদিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার বিষয়টি আলোচনায় আসে, অন্যদিকে তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ও বারবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে চব্বিশের অক্টোবরে আন্দোলনে নেমেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের চাপ থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্য ও আইনি জটিলতায় বেকায়দায় পড়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময় একটি দৈনিকের প্রধান সম্পাদককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, তিনি শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথিপত্র নেই।
রাষ্ট্রপতির এ কথা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। তাকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন মহল। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির আপত্তিতেই তখন পদত্যাগ করতে হয়নি মো. সাহাবুদ্দিনকে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় সব কাজে অপাংক্তেয় ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। প্রধান উপদেষ্টা সব অনুষ্ঠানে থাকলেও রাষ্ট্রপতিকে রাখা হয়নি। পরে এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি এসব কথাও বলেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এনসিপি ও জামায়াতসহ বিরোধী দলের তীব্র বাধার মুখে পড়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। তবে বিরোধী পক্ষের নানা বিরোধিতার পরও ক্ষমতাসীন দল তার ব্যাপারে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করেনি। বরং অনেকটাই তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল।
দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে তার পদত্যাগের দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদ ছাড়লেন।
বঙ্গভবন ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিন যে বাসায় উঠতে পারেন, গুলশানের সেই বাসায় এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। গতকাল বিকালে গুলশানের ১২৩ নম্বর রোডের ‘গ্রিন ভিলা’ নামে ওই বাড়িতে টেলিফোনের সংযোগ দিতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) দুজন কর্মচারী। পদত্যাগের পর এই বাড়ির পঞ্চম তলায় রাষ্ট্রপতির ওঠার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক টালমাটাল অধ্যায়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাজনৈতিক পালাবদল, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তার কিছু বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং কিছু বিষয়ে নীরব অবস্থানও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাই ইতিহাসে তার অধ্যায়টি শুধু দায়িত্ব পালনের নয়; অর্জন ও বিতর্ক— দুইয়ের সমন্বয়ে নির্মিত একটি জটিল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবেই বিবেচিত হবে।
বঙ্গভবনের দায়িত্ব শেষ হয়েছে। কিন্তু মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে কৌতূহল শেষ হয়নি। বরং এখন শুরু হচ্ছে তার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আনুষ্ঠানিকতা নেই, আছে শুধু ব্যক্তি সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে ভবিষ্যতের নানা প্রশ্নের অপেক্ষা।




