সংসদীয় যুগে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
- আজ মনোনয়ন দাখিল
- স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে প্রার্থী ঘোষণা করবে বিএনপি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সময়ের হিসাবে সাড়ে তিন দশক পর দেশে হতে যাচ্ছে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। প্রার্থীরা সরাসরি অথবা তাদের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে এ মনোনয়ন জমা দিতে পারবেন। আর তা গ্রহণ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে তিনটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি দুটি এবং জামায়াত জোট একটি ফরম নিয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত জোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া হবে বেলা ১১টায়। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন দুপুরের দিকে জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দলটির একটি সূত্র। এর আগে দুপুর ১২টায় দলের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীর সই নেওয়া হবে এবং প্রস্তাবক ও সমর্থকের সইসহ মনোনয়ন ফরম নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার জন্য একটি প্রতিনিধিদলও ঠিক করা হবে। দলটির সদস্যরাই ইসিতে গিয়ে মনোনয়ন জমা দেবেন।
এর আগে গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের জন্য চেয়ারম্যানের হাতে দায়িত্ব দেয় দলের স্থায়ী কমিটি। তবে তিনি কাকে নির্বাচন করেছেন বা করতে যাচ্ছেন, সে বিষয়টি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। জানা গেছে, বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আজই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। সে হিসাবে সবার মনোনয়ন জমা পড়লেই জানা যাবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন ফরম যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট, প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষে হবে ভোটগ্রহণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রত্যক্ষ ভোটাভুটিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের পর প্রতিবারই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ১৯৯১ সালের সংসদীয় ধারায় ফেরার পর ওই বছরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর পার হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোটাভুটির আর প্রয়োজন পড়েনি। তবে এবার জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করায় এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ও সার্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র কৌতূহল। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে এমপিদের বাধ্যবাধকতার কারণে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীই বিজয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন নিশ্চিত হলেও, প্রার্থী দিচ্ছে বিরোধী জোট।
১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত জামায়াত জোট তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যা হবে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়। অন্যদিকে জামায়াত জোট শেষ পর্যন্ত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আগের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন বিএনপির প্রার্থীকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করবে। এর আগ রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি ভোটে কয়েকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় উভয় ব্যবস্থার কারণে বহুবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপ্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী, সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন গোপন ভোটে। পরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির বিধান চালু করা হয়। তখন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। তবে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর পরই সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালু করা হয়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বর্তমানে সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটের বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন-১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এজন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনী কর্তা এতে সভাপতিত্ব করবেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। একই সঙ্গে মনোনীত ব্যক্তির সম্মতিসূচক বিবৃতিও দিতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন এজন্য ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে নির্ধারিত দিনে সংসদ কক্ষে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হবে। ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বোচ্চ ভোট একাধিক প্রার্থী সমানভাবে পেলে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী কর্তার ঘোষিত ফলাফলই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
গত ২৪ জুলাই বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি শূন্য হয়। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজউদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে এই পদে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন বৈঠক করে তফসিল অনুমোদন করে। এই নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে সংসদ নির্বাচনের পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে জনগণের সরাসরি ভোটের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার নিয়ম চালু হয়। ১৯৯১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত করে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। সেবার উভয় প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে বহাল ছিলেন এবং সংসদ সদস্যদের ভোট দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসার পর এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।




