কর্ণফুলী টানেল
৩০ বাংলো, স্যুট-মোটেল-পুল বানানোর যৌক্তিকতা কী
- বছরে ক্ষতি ৮১ কোটি টাকা
- চরম উচ্চাভিলাষী ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের স্পষ্ট উদাহরণ— আইএমইডি
- প্রাইভেট সেক্টরে লিজ দেওয়ার চিন্তাভাবনা
- সমীক্ষায় ২০২৫ সালে ৪৭ হাজার ১২৯টি যানবাহন প্রতিদিন চলার কথা, কিন্তু বাস্তবে চলে মাত্র ৪ হাজার

সংগৃহীত ছবি
কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ৭২ একরের বিশাল সার্ভিস এরিয়াটি মূলত চরম উচ্চাভিলাষী এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। টানেল সচল রাখার জন্য টোল প্লাজা, ওয়ে ব্রিজ এবং কন্ট্রোল রুমের প্রয়োজন থাকলেও ৩০টি বাংলো, ভিভিআইপি স্যুট, মোটেল, সুইমিংপুল বা অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে এসব।
টানেল নিয়ে এক সমীক্ষার খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-এশিয়ার আইকনিক প্রকল্পের নামে অপচয় করা হয়েছে বিপুল অর্থের। এটি পরিচালনায় লাভ তো দূরের কথা, এখন প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৮১ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়ন নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে। এর দ্বিতীয় খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনটি চলে এসেছে আগামীর সময়ের হাতে।
আইএমইডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। জুন মাসের শেষ দিকে চূড়ান্ত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। এটির প্রভাব মূল্যায়নে তিনি ব্যাপক আগ্রহও দেখিয়েছিলেন। আইএমইডিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রভাব মূল্যায়ন করেছে।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে ২২৯ একর। এটি হাতে নেওয়ার আগে যে সমীক্ষা করা হয়েছিল, সেখানে উল্লিখিত ট্রাফিক ভলিউমের মাত্র ১৪ শতাংশ যানবাহন টানেলটি ব্যবহার করছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০১৩ সালে শেষ হলেও বেজ-ইয়ারের ট্রাফিক না দেখিয়ে ট্রাফিক ফোরকাস্ট করা হয় ২০১৭-২০৬৭ সাল পর্যন্ত। ট্রাফিক গ্রোথ দেখানো হয় ২০১২-২০৭০ সাল পর্যন্ত। বেজ-ইয়ার ২০১৩ সালে যানবাহনের পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত কোনো ট্রাফিক মডেল (ফোর স্টেপ মডেল, অ্যাক্টিভিটি বেজ) ব্যবহার করা হয়নি। শুধু জোন কনসেপ্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে প্রশাসনিক ডেমোগ্রাফ সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এ ছাড়া সমীক্ষা প্রতিবেদনে পরিবেশ দূষণের উপাদান যা দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। টানেল প্রকল্প এলাকায় ৪৮৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সার্ভিস এরিয়া ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। এ ছাড়া সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা অনুসারে ২০২৫ সালে প্রতিদিন ৪৭ হাজার ১২৯টি যানবাহন চলাচলের কথা, কিন্তু বাস্তবে দিনে চলছে মাত্র চার হাজার। সে কারণে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা। টোল দ্বিগুণ বাড়িয়েও এই ক্ষতি কাটানো সম্ভব নয়। সমস্যা সমাধানের জন্য ট্রাক ডাইভারসন টানেলের প্রবাহ বৃদ্ধি, টানেল সংযোগ সড়ক বাড়ানোসহ পলিসিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমইডি।
প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্তরা সরেজমিন পরিদর্শন করেন প্রকল্প এলাকা। তাদের ভাষ্য হলো, টানেলের সেগমেন্ট লাইনিংয়ের সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ক্র্যাক (ফাটল), জয়েন্ট লিকেজ বা সেটেলমেন্টের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অন্যান্য সব বিষয়ই ভালো।
নির্মাণমানের প্রশংসা করে আরও বলা হয়, ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী এবং সামগ্রিক নির্মাণমান অত্যন্ত উন্নত এবং ল্যান্ডস্কেপিংয়ে ব্যবহৃত গাছপালা ও ওয়াকওয়েগুলো দেখতে আকর্ষণীয়। সার্ভিস এরিয়ার অভ্যন্তরীণ ইউটিলিটি সিস্টেম যেমন— পাওয়ার সাপ্লাই, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত মজবুতভাবে তৈরি। এই এরিয়ায় সাত দিন ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন জেনারেটর ব্যাকআপ সুবিধা আছে। কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত মসজিদ, হেলথ সেন্টার ও মিউজিয়ামের অবকাঠামোগত অবস্থা বর্তমানে বেশ ভালো।
আরও বলা হয়েছে, তবে মানুষের যাতায়াত ও ব্যবহার কম থাকায় সার্ভিস এরিয়ার ল্যান্ডস্কেপিং ও কিছু অবকাঠামোতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। ব্যবহার কম থাকায় কিছু অংশ সম্পূর্ণ অযত্নে পড়ে আছে এবং ছোটখাটো মেরামতের স্পষ্ট প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এমনকি মূল কনভেনশন সেন্টারে জানালার পানি চুইয়ে ভেতরে প্রবেশ করায় দেখা গেছে দেয়ালে দাগ।
জানা গেছে, বর্তমানে এই বিশাল অবকাঠামোটির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে এবং বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধি করতে এটিকে প্রাইভেট সেক্টরে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্র ও নদীর অতি কাছে অবস্থানের কারণে পুরো এলাকাটি পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে অসাধারণ বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে এর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, এটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যে কোম্পানি করেছে, সবার আগে সেটিকে ধরা উচিত। কারণ এখানে সবকিছুই বেশি বেশি দেখানো হয়েছে। তারাই বলেছে টানেলের ওপারে হোটেল-মোটেল ও পর্যটন কেন্দ্র করলে অনেক বেশি লাভ হবে। কিন্তু এখন বাস্তবতা উল্টো। তাই ওই কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। তার মতে, বেসরকারি খাতে এসব স্থাপনা ছেড়ে না দিয়ে সরকারি ব্যবস্থায় পরিচালনা করা দরকার।
আইএমইডি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে সেতু বিভাগ। মূল ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। সর্বমোট খরচ হয়েছিল ১০ হাজার ২৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এটির মূল কার্যক্রম ছিল টানেলসহ ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার রাস্তা এবং দুটি টিউব সংবলিত ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার মূল টানেল। এর মধ্যে টানেলের দৈর্ঘ্য দুই দশমিক ৪৫ কলোমিটার। এ ছাড়া উভয় পাশে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এপ্রোচ রোড, ভায়াডাক্ট ৭২৭ মিটার, টোল প্লাজা ৭৯ হাজার ৬০০ বর্গমিটার, দুটি পুলিশ ক্যাম্প, দুটি ফায়ার স্টেশন, দুটি সার্ভিস এরিয়া, সাব-স্টেশন স্থাপন ও ভূমি অধিগ্রহণ। আরও ছিল একটি টাগবোট ও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনাকাটা।







