দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
অসুস্থতা নাকি কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রাঙামাটি থেকে প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হয়েছিলেন দীপেন দেওয়ান। তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই খুশি হয়েছিলেন রাঙামাটির সব দল মতের মানুষ। কিন্তু এই আনন্দ বেশি দিন সয়নি পার্বত্য জেলার মানুষদের। মাত্র সাড়ে তিনমাসেই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হলো শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তাকে।
অথচ ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন ভিন্নকথা। তাদের দাবি তার শারীরিক অবস্থা এতটা খারাপ নয় যে, পদত্যাগ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধ আর শারীরিক অসুস্থতা, এই তিনে মিলেই অস্বস্তিতে ছিলেন মন্ত্রী। নিজের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে শেষপর্যন্ত পদত্যাগে বাধ্য হলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে আজ সোমবার বিকেলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানালেন, ‘সকালে বিটিভিতে খবর দেখে জানতে পেরেছি। এরপর আমি ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। তার ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।’ কী কারণে মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, আপনার কোনো ধারণা আছে- এমন প্রশ্নে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘অসুস্থ ছিলেন বলে শুনেছি।’
পহেলা জুন প্রধানমন্ত্রী বরাবরে লেখা পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান উল্লেখ করেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর হতে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।’ পত্রের ওপরের দিকে হাতের লেখায় ‘গৃহীত হলো’বলে উল্লেখ করা হয়।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের কারণ জানতে যোগাযোগ করা হয় রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে। বললেন , ‘তিনি আমার ফোনও ধরেন না, আমার সঙ্গে কথাও বলেন না। সর্বশেষ ১৬ মার্চ ঢাকায় গিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম সরাসরি। তাকে সবকিছুই বলেছি। তাকে এও বলেছি, আমি মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। কিন্তু আমি আপনার বিরোধিতা করিনি, আপনার জয়ের জন্য কাজ করেছি। দয়া করে আপনি আমার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার বিরোধিতা করবেন না। আমার কোনো কাজে বা আচরণে আপনি কষ্ট পাইলে ক্ষমা করে দেন। জবাবে শুধু বলেছিলেন- বেজার ন হইস (মন খারাপ করবেন না)! তবে আমি শুনেছি, উনি আমার বিরোধিতা করছিলেন। এখন কী কারণে পদত্যাগ করছেন, বুঝতে পারছি না আমি। আমিই কারণ কিনা, সেটাও জানি না।’
তবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতেও গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে এসে দৃশ্যত সুস্থই মনে হচ্ছিল তাকে। নিয়মিতই অংশ নিচ্ছিলেন দলীয় এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিতে। কিন্তু গত কিছুদিন সেখানেও ছিল তার অনুপস্থিতি। ঈদের ছুটিতেও রাঙামাটি আসেননি। এমনকি ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার কথা থাকলেও যোগ দেননি সেই কর্মসূচিতে।
মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপি সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির বলছেন, ‘খবর শুনে আমরা অবাক হয়ে গেছি। কল্পনাতেও ছিল না যে, এমন সিদ্ধান্ত উনি নিতে পারেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি, পরামর্শও করেননি। আর শারীরিক অবস্থাও এমন নয় যে, পদত্যাগ করতে হবে।’
স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, ছাত্রদলের কমিটি গঠন কিংবা অন্যান্য আরও বিষয়ও থাকতে পারে। যা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না নেতাকর্মীরা। কিন্তু মন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভবত ঠিক হয়নি।
‘কেন এমনটা করলেন, বুঝতেই পারছি না। আর যদি কোনো মান অভিমান বা অন্য কোনো কারণ থাকে, তিনি জেলা বিএনপি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, সেটাও করেননি। আমি বুঝতে পারছি না কেন এমন হলো’—যোগ করলেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন।
২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে দীপেন দেওয়ান বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমবার চাকরিবিধি কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারায় তার স্ত্রী মৈত্রী চাকমাকে মনোনয়ন দেয় দল। তিনি পরাজিত হন। ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন দীপেন দেওয়ান। ২০১২ সালের কাউন্সিলে সে পদ হারান দীপেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির রাজনীতিতে।
দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ছিলেন রাঙামাটি জেলার দীপেন দেওয়ান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপির সরকারের সময় রাঙামাটি থেকে প্রথম উপমন্ত্রী করা হয় মনিস্বপন দেওয়ানকে। তিনিও ২০০৬ সালে পদত্যাগ করেন। বিএনপি ছেড়ে এলডিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। সেই হিসেবে বিএনপির দুই শাসনামলের দুই মন্ত্রী-উপমন্ত্রী পদত্যাগ করে আলোচনার ঝড় তুললেন।
পদত্যাগ বিষয়ে কথা বলার জন্য অসংখ্যবার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে। যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি তার ব্যক্তিগত সহকারীদের সঙ্গেও।




