কর্মজীবী নারীর পোশাকে নতুন ঢং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
করপোরেট ফ্যাশনের নতুন ব্যাকরণ হলো শৈলী, স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মবিশ্বাসের সঠিক সমন্বয়। এই তিনে গুণান্বিত পোশাক বাড়িয়ে দেয় কর্মস্পৃহা। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার পাশাপাশি অফিসের পোশাকেও এসেছে চমকপ্রদ পরিবর্তন। প্রথাগত আঁটসাঁট ফরমাল পোশাকের ধারণা এখন অনেকটাই অতীত। বর্তমান করপোরেট দুনিয়ায় নারীদের ফ্যাশনের মূল কথাই হলো কাজের সঙ্গে আরামের সঠিক সমন্বয়।
দেশি ফ্যাশন হাউজ লা রিভের ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ বিভাগের ম্যানেজার মারুফা ইয়াসমিন জানালেন, দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করার জন্য এমন পোশাক বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে স্বস্তিদায়ক ও মার্জিত। কেননা পোশাক যে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় তা নয়— এটি পরিধানকারীর মানসিকতা এবং কাজের স্পৃহাতেও দারুণ প্রভাব ফেলে। ফ্যাশন মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ইনক্লোথড কগনিশন বা পোশাকের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। আমরা যে ধরনের পোশাকই পরি, তা আমাদের কাজের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মনোযোগকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একজন নারী যখন মানসম্মত এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই পোশাকে অফিসে উপস্থিত হন, তা শুধু বাইরের জগতের সামনেই নয়; তার নিজের মধ্যেও এক ধরনের দৃঢ়চেতা অনুভূতি এনে দেয়।
কর্মপরিবেশ, দায়িত্বভার, ব্যক্তিত্ব, স্মার্টনেস, কর্মঘণ্টা— এমন অনেক হিসাবনিকাশ মাথায় নিয়ে করপোরেট কস্টিউম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনেকেই হিমশিম খান। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাস্ট ফ্যাশনের উন্মাদনায় গা না ভাসিয়ে মানসম্মত কিছু পোশাক দিয়ে চমৎকার একটি ক্যাপসুল ওয়ার্ডরোব তৈরি করে ফেললে মিটে যাবে এ ধরনের নানা সমস্যা।
পোশাক নির্বাচন
প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে ‘কী পরব’— এই দুশ্চিন্তা দূর করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আলমারিতে অল্প, কিন্তু মানসম্মত এবং দীর্ঘদিন পরা যাবে এমন পোশাক রাখা। এক্ষেত্রে ওয়ার্ডরোবকে পোশাকের সংগ্রহ নয়, বরং একটি শৃঙ্খলা হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
ফ্যাশনকে শুধু প্রয়োজনের তাগিদে নয়; বরং নিজ ব্যক্তিত্বের সঠিক উপস্থাপনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখার তাগাদা দেন বিশেষজ্ঞরা
পোশাক কেনার আগে ভেবে দেখুন, এটি আপনার আলমারিতে থাকা কোন কোন পোশাকের সঙ্গে জুড়ি বানিয়ে পরা যাবে। সস্তায় অনেক পোশাকের চেয়ে সাধ্যের মধ্যে সেরা কয়েকটি কেনা সবসময়ই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এই পদ্ধতিতে পোশাক বেছে নিলে প্রতিদিনের স্টাইলিংয়ে এক ধরনের আভিজাত্য বজায় থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রবণতা কমে।
রঙের ভূমিকা
কর্মক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলতে রঙের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। লাল রঙের পোশাক যেমন কর্তৃত্ব ও সাহসের প্রতীক হিসেবে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে; তেমনি নীল রঙ বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শান্ত নেতৃত্বের বার্তা দেয়। গভীর সবুজ রঙ দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আর গভীর আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। তবে রঙের ব্যবহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য। কারণ আপনি যে রঙে নিজেকে বেশি প্রাণবন্ত অনুভব করেন, সেটিই আপনার সেরা পাওয়ার আউটফিট। তাই ফ্যাশনকে শুধু প্রয়োজনের তাগিদে নয়; বরং নিজ ব্যক্তিত্বের সঠিক উপস্থাপনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখার তাগাদা দেন বিশেষজ্ঞরা।
কাপড় বাছাই
বাংলাদেশের মতো আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় করপোরেট স্টাইল বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় অফিসে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার জন্য উপযুক্ত কাপড় বেছে নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। জর্জেট, লিনেন, সুতি, টেনসেল বা কটন ভয়েলের মতো ফেব্রিকগুলো বাতাস চলাচলে সহায়তা করে; ফলে শরীরের ঘাম শুষে দ্রুত শুকিয়ে যায়। অন্যদিকে সিনথেটিক বা পলিয়েস্টার ফেব্রিক গরমের দিনে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকে এবং অস্বস্তি তৈরি করে, যা কাজে মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। তাই অফিসের পোশাক কেনার সময় কাপড়ের গুণমানের দিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করার জন্য এমন পোশাক বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে স্বস্তিদায়ক ও মার্জিত। কেননা পোশাক যে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় তা নয়— এটি পরিধানকারীর মানসিকতা এবং কাজের স্পৃহাতেও দারুণ প্রভাব ফেলে
অফিসের প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য সুতি বা লিনেনের কুর্তি এবং কোঅর্ড সেট দারুণ জনপ্রিয়। একদম চাপা বা ফিটিংয়ের চেয়ে স্ট্রেইট কাট বা কিছুটা ওভারসাইজড ফিটের পোশাক আধুনিক স্মার্ট ক্যাজুয়াল ট্রেন্ডের বড় অংশ। লিনেন বা সুতির কুর্তি, কোঅর্ড সেট এবং স্ট্রেইট কাট ট্রাউজার্স এখনকার করপোরেট নারীদের প্রথম পছন্দ। বাংলাদেশের বাজারে আড়ং তাগা, সেইলর, ইয়েলো, টুয়েলভ কিংবা লা রিভের মতো দেশি ব্র্যান্ডগুলো কর্মজীবী নারীদের জন্য দারুণ সব কালেকশন তৈরি করছে। এসব ব্র্যান্ডের সুতি বা রেমি কটনের তৈরি টপ, কুর্তি বা কোঅর্ড সেটগুলো গরমের দিনে সারা দিন অফিসে কাটানোর জন্য বেশ উপযোগী।
অফিসের বিশেষ কোনো দিন বা গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের জন্য শাড়ি হতে পারে চমৎকার একটি পছন্দ। বিশেষ করে হাতে বোনা দেশীয় জামদানি শাড়ি আভিজাত্য প্রকাশের পাশাপাশি দেশীয় ঐতিহ্যেরও প্রতিনিধিত্ব করে। সুন্দর করে পরা একটি সলিড রঙের বা হালকা কাজের জামদানি শাড়ি করপোরেট পরিবেশে একজন নারীর রুচিশীলতার দারুণ প্রকাশ ঘটাতে পারে। প্রতিদিনের অফিসের জন্য হালকা কাজের সুতি বা লিনেন শাড়ি ভালো।
কেনার আগে
পোশাক কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাপড়ের উপাদানের লেবেল দেখে নেওয়া। সুতি, লিনেন বা টেনসেলের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর কাপড় কি না, তা নিশ্চিত েহান; কারণ এগুলো বাতাসে শরীরকে সতেজ রাখে। পোশাক পরে নড়াচড়া করে বা চেয়ারে বসে দেখুন, চলাফেরায় আরামদায়ক কি না। কাপড়ের সেলাইয়ের ফিনিশিং কতটুকু মজবুত এবং বারবার ধোয়ার পর রঙ ওঠার ঝুঁকি আছে কি না, তা-ও যাচাই করে নিন। অল্প কিছু মানসম্মত পোশাক দিয়ে একটি সিস্টেম বা ক্যাপসুল ওয়ার্ডরোব তৈরির কথা মাথায় রেখে কেনাকাটা করুন, যাতে একটি টপস বা বটম দিয়ে একাধিক লুক তৈরি করা যায়। পোশাকের মাপ নিজের শরীরের গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে দর্জির সাহায্যে ঠিকঠাক করে নিন; কারণ ফিটিং ভালো হলে সস্তা কাপড়ও দারুণ দেখায়।
কোথায় পাবেন, দাম কেমন
কুর্তি ও কোঅর্ড সেটের জন্য আড়ং তাগা, সেইলর, সারা, টুয়েলভ, ক্লাব হাউস, ইয়েলো কিংবা লা রিভের মতো দেশি ব্র্যান্ডগুলোয় ঢুঁ মারতে পারেন। এসব ব্র্যান্ডে সুতি ও লিনেন কাপড়ের কালেকশন পাওয়া যায় এবং ফরমাল কুর্তিগুলোর দাম সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। ভালো মানের সুতি বা লিনেনের কোঅর্ড সেট কিনতে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজেট রাখা ভালো।
শাড়ির ক্ষেত্রে আড়ং, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির কিংবা মিরপুরের শাড়িপল্লিতে যেতে পারেন। প্রতিদিনের অফিসের জন্য হালকা কাজের সুতি বা মসলিন শাড়ি ২ থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া সম্ভব। তবে আসল জামদানি শাড়ির দাম কারুকাজের ওপর নির্ভর করে ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন অনলাইন বুটিক পেজেও এখন ভালো মানের সুতি ও হাফ সিল্ক শাড়ির কালেকশন পাওয়া যায়।
ওয়েস্টার্ন স্টাইলের ফরমাল টপস ট্রাউজার্স বা ব্লেজারের জন্য লা রিভ, টুয়েলভ, জারা, ইয়েলো, সেইলরের মতো ব্র্যান্ডগুলোর আউটলেট কিংবা বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন পোশাকের দোকানে খেঁাজ নিতে পারেন। ভালো মানের ফরমাল টপস বা শার্ট ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং ট্রাউজার্স ২ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আধুনিক কাট বা টেইলরড ব্লেজারের দাম ফ্যাশন ব্র্যান্ড অনুযায়ী সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
টিপস
- খুব টাইট বা ঢিলেঢালা পোশাক না পরে নিজের মাপমতো পোশাক টেইলরিং করিয়ে নিলে দেখতে স্মার্ট ও মার্জিত মনে হয়।
- ভারী মেকআপ বা অতিরিক্ত গয়না এড়িয়ে হালকা ও স্নিগ্ধ সাজই অফিসের জন্য যথেষ্ট উপযোগী।
- ছোট কানের দুল আর হাতে একটি ক্ল্যাসিক ঘড়ি ব্যবহার করুন, যা আপনার লুককে পূর্ণতা দেবে।
- জরুরি জিনিসের জন্য সঙ্গে ব্যাগ এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক লোফার জুতা বেছে নিতে পারেন।
- প্রতিদিন সকালে কী পরবেন, সেই দুশ্চিন্তা দূর করতে প্রতি সপ্তাহের পোশাকের একটি কম্বিনেশন তৈরি করে রাখুন।
- অফিসে ফ্যাশনের ক্ষেত্রে আরাম ও পেশাদারত্বের মেলবন্ধন বজায় রাখা ভালো।







