ভিআইপি ফুটপাতে মাদকসেবী-ছিনতাইকারী-ভাসমান পতিতা!

পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর ও সার্কিট হাউসের সামনের ফুটপাতে নেশাগ্রস্তদের অস্থায়ী আবাস। ছবি : রনি দে, আগামীর সময়, চট্টগ্রাম
পাহাড়চূড়ায় ব্রিটিশদের বানানো ‘লর্ডস কটেজ’। এখন জিয়া স্মৃতি জাদুঘর। তার পাশে একমাত্র পাঁচতারকা হোটেল রেডিসন, সার্কিট হাউস, চট্টগ্রামের প্রথম স্টেডিয়াম, নৌবাহিনীর কমান্ডারের বাসভবন ‘হেরিটেজ’ ও নেভাল মিউজিয়াম। খেলার সামগ্রী, কাবাব আর দেশি-বিদেশি খাবারের রেস্তোঁরা। ১৪৮ বছরের পুরনো চট্টগ্রাম ক্লাব।
কাজীর দেউড়ি এলাকায় পৌনে ৯ লাখ বর্গফুটের স্টেডিয়াম পাড়া। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের আনাগোনায় এর সাধারণ পরিচিতি হয়ে গেছে ‘ভিআইপি এরিয়া’। কর্মব্যস্ত মানুষ আসেন শান্তির খোঁজে এখানে।
এমন সমৃদ্ধ ‘ভিআইপি এরিয়ায়’ সন্ধ্যার পর শুরু হয় ছিঁচকে অপরাধীদের সীমাহীন উৎপাত। শুধু কি রাতে? দিনেও দেখা যায় ভিআইপি এরিয়ার সঙ্গে বেমানান এমন দৃশ্য। ফুটপাতে ভাসমান দোকান, রাস্তাজুড়ে মোটর সাইকেল। ভিক্ষুক, রোহিঙ্গা, সংঘবদ্ধ হিজড়া, কিশোর গ্যাং, মাদকসেবী -বিক্রেতা, ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী, ভাসমান পতিতা— সবার আস্তানা।
এক ব্যবসায়ীর আক্ষেপ, ‘নামেই ভিআইপি এরিয়া। এই এরিয়ার মা কে, বাপ কে বোঝা মুশকিল। এখানে সিটি করপোরেশনের চেয়ে ফুটপাতের দোকানির ক্ষমতা বেশি। কোটি টাকা বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীর চেয়ে ভিক্ষুকের দাপট বেশি।’
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক তিন অধিনায়ক আকরাম খান,মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, তামিম ইকবালসহ ক্রীড়াঙ্গনের অনেক তারকার উত্থান কাজির দেউড়ির মোড় থেকে শুরু হওয়া এই স্টেডিয়াম পাড়ায়।
দুইদিন ধরে সন্ধ্যায় এলাকা ঘুরে দেখা গেল, ‘আলোর নিচে অন্ধকার’। কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে মুক্তমঞ্চ ও দক্ষিণের আউটার স্টেডিয়ামের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত মাত্র ২৫০ মিটার এলাকায় অন্তত ২৬টি ভাসমান দোকান। সিঙারা-সমুচা, আলুপুরি, লুচি-আলুর তরকারি, মুরগির মাংস ভাজা, চটপটি-ফুচকা, নুডলস, হরেক রকমের চা-কফি, পান-সিগারেট, ফুল, খেলনা, পারফিউম, ওজন মাপার যন্ত্র, টিয়ে পাখি দিয়ে ভাগ্য গণনা— কী নেই!
মুক্তমঞ্চ ঘিরে যেন জনসমাবেশ। কিশোর-তরুণদের কেউ প্রকাশ্যে সিগারেট টানছে। ছেলে-মেয়ে ঝগড়া করছে অকারণে। কেউ গিটারেও সুর তুলছে। জটলায় আছে কিশোরী-তরুণীও।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা জানালেন, প্লাস্টিকের কাপ-প্লেট, খাবারের অবশিষ্টাংশ, ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর হয়ে থাকে ফুটপাত। গভীর রাত পর্যন্ত জটলার কারণে তারা ময়লা অপসারণ করতে পারেন না সময়মতো।
চসিক সচিব আশরাফুল আলম অবশ্য খোঁজ নিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করবেন বলে জানালেন। অভিযান আর শুরু হয় না। ভিআইপি এরিয়াও আর প্রাণ ফিরে পায় না।
মুক্তমঞ্চের পর সাকুরা কাবাব, দারুল কাবাব, রোদেলা বিকেল, রয়েল হাট, সাব জিরো, রেড চিলি হয়ে স্টেডিয়ামের মূল গেট পর্যন্ত ভিক্ষুকের মেলা। রেস্তোঁরায় খেতে আসা একেকজনকে ঘিরে ধরছে ৪-৫ জন। ৪ বছরের অবুঝ শিশুটিও টাকার জন্য প্যান্ট-ব্যাগ টেনে ধরছে। কিছুতেই নিস্তার মিলছে না।
৮০ বছর বয়সী ভিক্ষুক জান্নাতি বেগমের সঙ্গে আলাপ হয়। ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া যে বছর মারা যায়, সেই বছর আমার বেডা (স্বামী) আমাকে নিয়ে কুমিল্লা থেকে এখানে আসে। রাজমিস্ত্রি ছিলেন। মারা গেছেন। আমি হোটেলে মশলা বাটতাম। এখন পারি না। আমি বাসায় বসে থেকে লাভ কী! সন্ধ্যার পর ভিক্ষা করে ২০০-৩০০ টাকা পাই।’
জানা গেল, ভিক্ষুক, মাদকসেবীদের অধিকাংশই সিআরবি, কদমতলী এলাকার বিভিন্ন বস্তি থেকে আসে। এদের মধ্যে রোহিঙ্গাও আছে। পুলিশ একবার অভিযান চালিয়ে ৫৪ জন রোহিঙ্গা আটক করেছিল। এরপর কমলেও সম্প্রতি উৎপাত আবার বেড়ে গেছে।
৩০ বছর ধরে এখানকার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা প্রতাপ ধর বললেন, ‘ভিক্ষুক, নেশাখোর এরা ফুটপাতে থাকলেও একতাবদ্ধ। চার-পাঁচশ মানুষ মুহূর্তেই জড়ো হয়ে যেতে পারে। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করে না।’
হিজড়াদের ‘চাঁদাবাজি’ নিয়ে জানালেন রোদেলা বিকেলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সামশুদ্দিন। ‘প্রতি দোকান থেকে রোববার সাপ্তাহিক চাঁদা নেয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। দুই ঈদে, পহেলা বৈশাখে, শবে বরাতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে। না দিলে রেস্টুরেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে বাজে অঙ্গভঙ্গি করে উৎপাত করতে থাকে।’
স্টেডিয়াম মসজিদের পেছনে ফুটপাতে বসা এক লোক পকেট থেকে এক পুরিয়া গাঁজা বের করে জানাল, রেলস্টেশন থেকে কিনেছে। দাম ১০০ টাকা। ইয়াবা চাইলেও এনে দিতে পারবে।
রোদেলা বিকেলের বিপরীতে ফুটপাতে মশারি টানিয়ে একাধিক জটলা। রাত নামলেই মশারির ভেতর নেশার আসর বসে, জানালেন নিয়মিত আসা কয়েকজন গাড়িচালক।
উৎপাতে অতীষ্ঠ হাইওয়ে সুইটসের কর্ণধার চৌধুরী মুরাদ বললেন, ‘আগে নিয়মিত এখানে আসতাম। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসতাম। এখন আসতে ভয় লাগে। এলাকাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
বিএসআরএম’র কর্মকর্তা এস এম আবু ইউসুফ ক্ষোভ জানালেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি, ‘ফাইভ স্টার হোটেলের বাইরে মাদকের আসর। রাস্তায় গাড়ির জ্যাম। মারামারির মধ্যেও কয়েকবার পড়েছি। পুলিশ, র্যাব এদের কাজ কী!’
রাত বাড়ছে। স্থায়ী দোকানগুলোর শাটার নামছে। শাটারে দড়ি বেঁধে মশারি টানিয়ে ফুটপাতে শয্যা পেতেছে ভাসমান লোকজন। বাড়ছে ভাসমান পতিতাদের আনাগোনাও। নির্জন অন্ধকার স্পটগুলো হয়ে উঠছে ‘গরীবের রঙমহল’। পুলিশ টহল দিচ্ছে। দেখেও না দেখার ভান। এই হলো ভিআইপি এরিয়ার রাতের দৃশ্য।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিনের ভাষ্য, ‘রেলস্টেশন, সিআরবি, গোয়ালপাড়া বস্তি, স্টেডিয়াম এলাকায় মাদক বিক্রি, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ হয়। শত, শত ছোটবড় অপরাধী। আমরা গ্রেফতার করি, জেলে পাঠাই। জামিনে বেরিয়ে আবার শুরু করে।’







