ডিজিটাল নজরদারিতেই ধাক্কা ৭১৩ প্রকল্পের তথ্য নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বছরের পর বছর ধরে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি চেনা চিত্র— কাজের গতি ধীর, সময়মতো শেষ হওয়ার নজির কম, আর প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো যেন অলিখিত নিয়ম! এতে একদিকে যেমন সরকারের হাজারো কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে অমূল্য সময়। এই বাস্তবতা বদলাতে চলমান প্রকল্পগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের আওতায় এনে নিয়মিত নজরদারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সেই উদ্যোগের শুরুতেই সামনে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অধিকাংশ প্রকল্পের তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক প্রকল্পে এখনো পরিচালক নিয়োগ হয়নি, আবার কিছু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করার নতুন এই উদ্যোগই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে নিয়মিত প্রকল্প তদারকির জন্য একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরির নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে বিষয়টি এনইসির সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, দেশের সব চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি এক জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া।
কিন্তু ড্যাশবোর্ড তৈরির কাজ শুরু করতেই দেখা গেছে, বর্তমানে চলমান ১ হাজার ৩৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৬৪৬টির তথ্য এতে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৭১৩টি প্রকল্পের কোনো প্রতিবেদনই পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, ২৩টি প্রকল্পে এখনো কোনো প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ৩৬টি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার নতুন ড্যাশবোর্ডটি পরীক্ষা করে দেখার কথা রয়েছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকির। নিজ নিজ দপ্তর থেকেই তারা ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করে এর কার্যকারিতা যাচাই করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ড্যাশবোর্ড তৈরির দায়িত্বে থাকা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) যুগ্ম সচিব (সমন্বয়) ওয়াহিদা হামিদ আগামীর সময়কে বলেছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের সংকট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা। তার ভাষায়, বর্তমানে ই-পিএমআইএস সফটওয়্যারে নিয়মিত প্রকল্পের তথ্য হালনাগাদ করার কথা থাকলেও অনেক সংস্থা প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক তথ্য দেওয়া তো দূরের কথা, সফটওয়্যারটিই খুলে দেখেন না।
আইএমইডি সূত্র জানায়, ড্যাশবোর্ডটি পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং আইএমইডির সচিব সরাসরি দেশের সব প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। অন্যদিকে মন্ত্রী, সচিব ও সংস্থাপ্রধানরা শুধু নিজেদের মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলো দেখতে পারবেন। মোবাইল ফোন থেকেও প্রকল্প পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত সচিব, প্রকল্প পরিচালক এবং পরিকল্পনা উইংয়ের প্রধানরাও এতে যুক্ত হয়ে তথ্য হালনাগাদ করতে পারবেন।
তথ্য না পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে আইএমইডির ছয়টি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টরের অধীনে সবচেয়ে বেশি রয়েছে সেক্টর-৩-এ, যেখানে ১৩৫টি প্রকল্পের প্রতিবেদন অনুপস্থিত। এ ছাড়া সেক্টর-৪-এ ১০৬টি, সেক্টর-৬-এ ৮৮টি, সেক্টর-৫-এ ৮৩টি, সেক্টর-১-এ ৭৩টি এবং সেক্টর-২-এ ৪৭টি প্রকল্পের তথ্য পাওয়া যায়নি। বারবার তাগাদা দিয়েও এসব প্রকল্পের প্রতিবেদন না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে আইএমইডি।
অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালক ছাড়াই এগিয়ে চলেছে ২৩টি উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারের বরাদ্দ রয়েছে ৩৫৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে জেলা জজ কোর্ট ভবন, জেলা জজের বাসভবন ও বাংলাদেশ জুডিশিয়াল একাডেমির উন্নয়নে সম্ভাব্য সমীক্ষা, পদ্মা ওয়েল কোম্পানির প্রধান কার্যালয় নির্মাণ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের জন্য সেবা উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্প।
এ ছাড়া রয়েছে নদী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদী এবং টাঙ্গাইলের নদীতীর সংরক্ষণ, খুলনার সালতা নদী উন্নয়ন, ভোজ্য তেলে ভিটামিন মিশ্রণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, জাতীয় জাদুঘর উন্নয়ন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ এবং পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে সম্ভাব্য সমীক্ষা প্রকল্প।
তালিকায় আরও রয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নসংক্রান্ত সমীক্ষা, মহাখালীতে পর্যটন ভবন নির্মাণের সম্ভাব্য যাচাই, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জেলাপর্যায়ে নারীদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তথ্য হালনাগাদে সংশ্লিষ্টদের অনীহা, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করা না গেলে এই ডিজিটাল উদ্যোগও প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না।




