বিমানমন্ত্রী
অ্যাভিয়েশন খাতের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সংশোধন হচ্ছে আইন

দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের অ্যাভিয়েশন’ শীর্ষক নীতি সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত
বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের অংশীজনদের জন্য বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ৪২ বছর পর বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের আইন ও বিধি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব বিধিনিষেধ অংশীজনদের কাজের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে, সেগুলো সরিয়ে দিয়ে তাদের কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে।
শনিবার রাজধানীর কুর্মিটোলার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের দ্য প্রেস্টিজ হলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের অ্যাভিয়েশন’ শীর্ষক নীতি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘৪২ বছর পর আমরা বেসামরিক বিমান চলাচলের আইন ও বিধি পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। যে আইনটি অংশীজনদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটি আমরা সরিয়ে দিচ্ছি। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। এত বছর পর কেন আমরা এই পরিবর্তন করছি? কারণ, আমাদের অংশীজনদের জন্য জায়গা তৈরি করে দিতে হবে। তাদের সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পুরোনো বিধি দিয়ে তাদের আটকে রাখার কোনো মানে নেই।’
আইন ও বিধিমালা প্রণয়নে অংশীজনদের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘বিধিমালা তৈরিতে আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আপনারা আপনাদের মতামত দেবেন। আমরা এ বিষয়ে আরও একটি সভা করব। সেখানে আপনাদের যা যা বলার প্রয়োজন এবং কোন কোন জায়গায় সংশোধন করলে আপনারা সহজভাবে কাজ করতে পারবেন, সেসব বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা করবেন।’
মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দেশের অ্যাভিয়েশন খাতকে একটি আঞ্চলিক অ্যাভিয়েশন হাবে পরিণত করার কাজ শুরু করেছে। সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে অ্যাভিয়েশন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অ্যাভিয়েশন খাতকে ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় পেয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও ভোগান্তি নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। এসব সমস্যা কমিয়ে আনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগে বিমানবন্দরের কনভেয়ার বেল্টে ছেঁড়া বেল্ট পাওয়া যেত। লাগেজ পেতে যাত্রীদের দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এরই মধ্যে এসব সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করেছি। কয়েক দিন আগেও আমি নিজে বিমানবন্দর পরিদর্শন করে নির্দেশনা দিয়েছি, যাত্রীদের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কার্গোর দরজাও খুলতে হবে। একদিকে যাত্রীরা নামবেন, অন্যদিকে একই সময়ে কার্গো নামানো হবে, যাতে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ বেল্টে চলে আসে।’
তিনি জানান, এর পাঁচ দিনের মাথায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখন বেল্ট থেকে লাগেজ নিতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগছে না।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, অ্যাভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা থাকবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দেশের অ্যাভিয়েশন খাতকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব বাংলাদেশকেই নিতে হবে। বিদেশিরা এসে এ খাত গড়ে দিয়ে যাবে না। তবে আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা এ কাজে সহযোগিতা করতে পারেন।
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, জাতীয় এয়ারলাইনকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, যাত্রী পরিবহন বাড়ানো, নতুন রুট চালু এবং বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে উড়োজাহাজের বহরও বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ বোয়িং কিনবে, নাকি এয়ারবাস, সেটি দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালকে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে দ্রুত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একটি আলোচনা কমিটি গঠন করে জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত আলোচনা শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ আলোচনা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের অ্যাভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন।
তিনি বলেন, দেশে ফ্লাইং একাডেমি থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী পাইলট তৈরির সক্ষমতা সীমিত। একইভাবে মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারেরও সংকট রয়েছে। এ খাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও সময়োপযোগী নয়।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন বলেন, বিশ্বের অ্যাভিয়েশন খাতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে। তবে উড়োজাহাজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো এখনো এগিয়ে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশেরও অ্যাভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস খাতের সম্ভাবনার দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
এতে আরও বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস (টাস) গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার।




