এখন সময় কথা বলার নয়, দেশ পুনর্গঠনের : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি সব ধরনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।
সরকারপ্রধান বলছিলেন, অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এখন সময় দেশ পুনর্গঠন করার, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে ধৈর্যসহকারে ঠান্ডা মাথায় যারা ষড়যন্ত্র করতে চায়, তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং জনগণকে সতর্ক করা। একই সঙ্গে জনগণের সামনে দেওয়া পরিকল্পনাগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ চায় শান্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান। পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক অধিকার যথাসময়ে প্রয়োগ করতে চায়। কাজেই আসুন, জনগণ যেটি চায় আমরা সেই কাজে নিজেদের নিয়োজিত করি।
ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে এই আলোচনা সভা হয়। সভায় জুলাই আন্দোলনে শরিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতারাও ছিলেন।
জুলাই আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আমার নিজের দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, যারা রাজপথে ছিলেন, তারাসহ নাম জানা না বহু মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, সরকারের পক্ষে সামনের দিনে যতটুকু সম্ভব হবে, আমরা তাদের সাথে আছি। আমরা সাধ্যমতো এই মানুষগুলোর পাশে থাকব, যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করব, যাদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।’
একই সঙ্গে স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পথে থাকতে চায় বিএনপি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান এদেশের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সময় প্রায় ৮০ হাজার শিল্প-কলকারখানা হয়েছিল। কাজেই তাদের সেই দল সেই পথ ধরে রাখতে চায়, যেই কাজগুলোর ফল জনগণ পাবে।
তিনি বলেন, জনগণ দেখবে বিএনপি এই কাজগুলো করেছে বলেই আমার পরিবার বা সন্তান একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রাজনীতি এটাই হওয়া উচিত। অনেকে অনেক কথা বলবে, সব কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘এখানে যারা আছেন বিভিন্ন অত্যাচার-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, বিভিন্ন কিছু হারিয়েছেন। আমি আমার বাড়িঘর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। যেই বাড়ি রেখে চলে গিয়েছিলাম সেই বাড়ি আমি দেখিনি। আমরা সকলেই বহু কিছু হারিয়েছি। এখন আমাদের মাইন্ডসেট চেঞ্জ করার একটি সময় চলে এসেছে। জনগণ রায় দিয়েছে। আমরা কী পাব সেটি বড় কথা নয়। আমরা কী দিতে পারব দেশ এবং জনগণের জন্য সেটিই হোক আজকের এই আলোচনা সভার শপথ, এটি হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।’
তারেক রহমান আরও বলেন, কয়েকদিন আগে প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা হলো। ২২ লাখ ছেলেমেয়ে এটায় অংশগ্রহণ করেছে। আমরা যখন আলোচনায় বসি, বক্তব্য দেই অনেক অনেক সমস্যা। আমাদের তরুণসমাজ ড্রাগে জড়িয়ে যাচ্ছে। এখন আপনি কতজনকে চিকিৎসা দেবেন আর কতজনকে ধরে জেলে দেবেন? তাহলে উপায় বের করতে হবে। আপনাকে এনার্জি বার্ন করার ভেন্যু দিতে হবে। আমার ছোটবেলায় গিটার বাজানোর ইচ্ছা ছিল, পিয়ানো বাজানোর ইচ্ছা ছিল। আমি পারি নাই। আপনাদেরও হয়তো ইচ্ছা ছিল, শিখতে পারেননি। এরকম লক্ষকোটি বাচ্চা, যাদের মধ্যে ইচ্ছাটা আছে, তাদের সেই সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই সে ভালো রাস্তায় চলে আসবে।
ফাতেমা কথা
সরকারপ্রধান বলেন, এখানে যারা বিএনপির নেতাকর্মী আছেন সবাই একটি নামের সাথে পরিচিত। নামটা হচ্ছে ফাতেমা। আম্মার (বেগম খালেদা জিয়া) সাথে সে-ও জেলও খেটেছে। ফাতেমার এক ছেলে আছে। ওইদিন জাইমা (জাইমা রহমান) আমাকে কথাটা বলছিল। ফাতেমার ছেলে এখন তার সাথে থাকে। আম্মার সাথে যখন ফাতেমা ছিল তখন ও দেশের বাড়িতে থাকত। এখন ওর ছেলেমেয়ের সাথে থাকে। ওর ছেলে একদিন বলছে, মা আমাকে অমুক ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করে দাও। তাহলে বাচ্চাটা যখন তার নিজের জন্য চিন্তা করছে, আমরা সামগ্রিকভাবে দেশের সন্তানদের জন্য কেন ভালো কিছু চিন্তা করব না? আমাদের বুঝতে হবে সন্তানরা কী চায়। তাদের জন্য সেই পথটা তৈরি করতে হবে।
বক্তব্যে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের ওপর জোর দেন তিনি। বলেন, আমরা শিক্ষা কার্যক্রমটা সেভাবেই ঢেলে সাজাতে চাচ্ছি। জুলাই চেতনা বলেন, স্বাধীনতার চেতনা বলেন বা যেটাই বলেন— আমরা এটাতেই বিশ্বাস করি। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি শহীদ জিয়া এভাবেই চিন্তা করতেন দেশের মানুষের জন্য, খালেদা জিয়া এভাবেই চিন্তা করতেন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। স্বাভাবিক আমিও এভাবেই চিন্তা করব।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে আমরা আছি
জুলাই আন্দোলন জনগণের আন্দোলন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই আন্দোলনে সফলতা এসেছে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলেছে। আমরা সাফ বলে দিয়েছি, জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের জনগণের। এটি কোনো একক ব্যক্তি, একক কোনো রাজনৈতিক দলের ক্রেডিট নয়।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর আমাদের নেতাকর্মীরা জনগণকে একা রেখে মাঠ ছেড়ে যায়নি। জুলাই-আগস্টে যে সফলতা এসেছে সেটি জনগণ সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে বলেই সফল হয়েছে। অর্থাৎ এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণের আন্দোলন। ঠিক যেভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র চেয়েছে বলে সেদিন আমাদের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিল।
৩১ দফা জনগণের
বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংস্কার প্রস্তাব এবং শরিক দলগুলো নিয়ে ৩১ দফার সংস্কার প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। বলেন, বিগত নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষে তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা জনগণের সামনে ৩১ দফা উপস্থাপন করেছি। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে, রাষ্ট্র মেরামতের যেই দফাগুলো আমরা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মাধ্যমে— সেই প্রস্তাবকেই বিগত নির্বাচনে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে।
তিনি বলেন, কাজেই এখন ৩১ দফাটা হচ্ছে জনগণের ৩১ দফা। আমাদের ৩১ দফার মূল লক্ষ্য জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। এ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা-বিভাজিত প্রশাসন-পুলিশ প্রশাসনের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় জুলাইয়ের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু অংশ নেন।
আরও ছিলেন মহানগর উত্তর বিএনপির আমিনুল হক, দক্ষিণ বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন ও ছাত্রদলের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাকিব।
অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।







