এআই যেভাবে জীবনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে

ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের ডেটা সেন্টার। ছবি : সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে মানুষের স্বপ্নের শেষ নেই। কাজ সহজ হবে। উৎপাদন বাড়বে। তৈরি হবে নতুন শিল্প। আসবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। অর্থনীতিও পাবে নতুন গতি; কিন্তু সেই ভবিষ্যতের সুফল আসার আগেই দেখা দিচ্ছে কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও চাকরি হারাচ্ছেন মানুষ। কোথাও মজুরি বৃদ্ধির গতি কমছে। বাড়ছে সম্পদের বৈষম্য। এর সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে মূল্যস্ফীতি।
এআইয়ের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তার প্রভাব এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে মানুষের দৈনন্দিন খরচে। চলতি বছর এআই গ্রহণ ও অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বিপুল বিনিয়োগের চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ, মেমোরি চিপ, কম্পিউটার, গেমিং কনসোল, সফটওয়্যার এমনকি নির্মাণ খাতেও। ফলে এআই শুধু প্রযুক্তির দুনিয়া বদলাচ্ছে না। ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে মানুষের খরচের হিসাবও।
মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির মতে, এআইয়ের কারণে মূল্যস্ফীতির যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিবারকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় একই পণ্য ও সেবা কিনতে ৩৭৫ ডলারের কিছু বেশি অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। এই চাপ যদি আরও খাতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। আর সেই সম্ভাবনাই এখন নজরে রাখছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক।
বিদ্যুতের বিলেও এআইয়ের ছাপ
এআইয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটি বিদ্যুৎ। একটি এআই মডেল চালাতে শুধু কম্পিউটার থাকলেই হয় না। প্রয়োজন বিপুল সার্ভার। প্রয়োজন বিশাল ডেটা সেন্টার। আর এসব ডেটা সেন্টার চালাতে লাগে প্রচুর বিদ্যুৎ।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় গ্রিড অপারেটর পিজেএম ইন্টারকানেকশন সম্প্রতি জানিয়েছে, নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার তুলনায় ডেটা সেন্টার তৈরি বা সম্প্রসারণ করা যায় দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত।
ফলে তৈরি হচ্ছে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান। এর সঙ্গে রয়েছে পুরনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাড়ছে বিদ্যুতের ব্যবহার। বাড়ছে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি। পুরনো হয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর একটি বড় অংশ।
বার্কলেসের মার্কিন অর্থনীতিবিদ পূজা শ্রীরামের মতে, ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
পূজা শ্রীরামের মতে, আবাসিক বিদ্যুতের খরচ বাড়ার পেছনে এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদার প্রভাবের এটিই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি।
মেমোরি চিপের বাজারেও এআইয়ের চাপ
ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন শুধু বিদ্যুৎ নয়। প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ মেমোরি ও স্টোরেজ। এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের কারণে এসব চিপের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে; কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি। ফলে মেমোরি চিপ নির্মাতারা এখন বেশি লাভজনক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
ল্যাপটপ থেকে গেমিং কনসোল
এআইয়ের প্রভাব এখন আর শুধু অদৃশ্য কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ক্রেতাও এর প্রভাব টের পাচ্ছেন। গত মাসের শেষ দিকে অ্যাপল তাদের জনপ্রিয় কিছু পণ্যের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে।
কোম্পানিটির ব্যাখ্যা, এআই ডেটা সেন্টারের কারণে মেমোরি ও স্টোরেজের চাহিদায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে।
গেমিং কনসোলের বাজারেও একই চিত্র। চলতি বছর সনি তাদের প্লেস্টেশন কনসোলের দাম বাড়িয়েছে। গত মাসে মাইক্রোসফটও এক্সবক্স কনসোলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, বর্তমান উপাদান সংকটে পুরো ভোক্তা ইলেকট্রনিকস শিল্পই সমস্যার মধ্যে রয়েছে। তবে গেমিং কনসোলের ওপর এর প্রভাব বিশেষভাবে বেশি।
এতদিন কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার ছিল এমন একটি খাত, যেখানে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে ক্রেতারা একই দামে ক্রমেই বেশি সুবিধা পেতেন।
এআই সুবিধা নিতে বাড়ছে সফটওয়্যারের খরচ
এআইয়ের খরচ শুধু হার্ডওয়্যারে আটকে নেই। সফটওয়্যার ব্যবহারকারীদেরও এর জন্য বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়িক সফটওয়্যারে এআই সুবিধা যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান দাম বাড়াচ্ছে।
মাইক্রোসফটের অফিস ৩৬৫ তার একটি উদাহরণ। ফেব্রুয়ারিতে ব্যক্তিগত অফিস ৩৬৫ প্ল্যানের দাম ৪৩ শতাংশ বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিবারভিত্তিক প্ল্যানের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
এর আগে প্রায় এক দশক ধরে এই দাম অপরিবর্তিত ছিল। দাম বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাইক্রোসফটের এআই টুল কোপাইলট। অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা নতুন এআই সুবিধা পাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু সেই সুবিধার জন্য বাড়তি অর্থও গুনতে হচ্ছে।
নির্মাণ খাতেও বাড়ছে প্রতিযোগিতা
এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে নির্মাণ খাতে। ডেটা সেন্টার তৈরিতে বিপুল পরিমাণ তামা ও বৈদ্যুতিক তারের প্রয়োজন হয়। এসব উপকরণের চাহিদা বাড়ছে।
একই সঙ্গে বাড়ছে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা। ম্যাকোয়ারি গ্রুপের গ্লোবাল এফএক্স ও রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট থিয়েরি উইজম্যানের মতে, এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নির্মাণ খাতের মজুরি পর্যবেক্ষণ করা।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে বাড়ির দামেও
এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি বড় উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন এরই মধ্যে অনেক মানুষের নাগালের বাইরে। বাড়ির দাম নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এখন যদি নির্মাণ খাতে শ্রমিকের মজুরি আরও বাড়ে, তাহলে বাড়ি নির্মাণের খরচও বাড়তে পারে।
থিয়েরি উইজম্যানের মতে, নির্মাণ খাতে মজুরি দ্রুত বাড়ার ফলে আবাসনের দামেও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ এআইয়ের প্রভাব হয়তো শুধু প্রযুক্তিপণ্যের দোকানেই থামবে না। এর ছায়া পড়তে পারে মানুষের ঘরেও। বিদ্যুতের বিল বাড়ছে। মেমোরি চিপের দাম বাড়ছে। ল্যাপটপ ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের খরচ বাড়ছে। গেমিং কনসোলের দামও বাড়ছে। এআই সুবিধার সঙ্গে সফটওয়্যারের দাম বাড়ছে। এরপর নির্মাণ খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে আবাসনেও।
সূত্র : সিএনএন








