তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা একটি ব্যস্ত শহর। এটি সবারই জানা। ব্যস্ত শহরের ভেতরেই রমনা পার্কের অবস্থান। রমনা যেন এক টুকরো সবুজ চাদর। চারদিকে যখন গাড়ির প্যাঁ পুঁ শব্দ। তখন একটু শান্তির পরশ পেতে চাইলে যেতে হবে রমনায়। কারণ, ভেতরে ঢুকলেই মনে হবে, কেউ হয়তো পৃথিবীর শব্দের ভলিউম কমিয়ে দিয়েছে। বিশাল সবুজের আচ্ছাদন, ছায়ায় ঘেরা, পুরনো গাছের সারি আর বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ— সব মিলিয়ে রমনাকে আমার কাছে মনে হয় এক অক্সিজেনের কারখানা।
একদিন বিকালে একা হাঁটতে হাঁটতে পার্কের ভেতরে চলে গেলাম। আকাশে তখন মিষ্টি রোদ।
সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে সবুজ ঘাসে আশ্রয় নিয়েছে। কোথাও ঘাসের ওপর শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, কোথাও দুজন মানুষ চুপচাপ বসে আছে, কেউ আবার পরিবেশ উপভোগ করছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে গেল একটি বিশাল পুরনো গাছের দিকে তাকিয়ে।
গাছটি যেন ইতিহাসের সাক্ষী। শাখাগুলো ছড়িয়ে আছে অনেক দূর পর্যন্ত। নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। কেন যেন মনে হলো, গাছটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি এখানে কত বছর?’
অমনি পাতাগুলো দুলে উঠল। মনে হলো, গাছটি মৃদু হেসে বলছে, ‘অনেক বছর। আমি দেখেছি তোমাদের আসা-যাওয়া। এখানে কেউ সময় কাটাতে, কেউ মন খারাপ নিয়ে। কেউ আমার ছায়ায় বসে প্রেমের গল্প করতে, আবার কেউ আসে চোখের জল ফেলতে।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি তাহলে অনেক মানুষের গল্প জানো।’
গাছটি বলল, ‘জানি, কিন্তু একজনের গল্প আরেক জনকে বলি না। মানুষের গোপন গল্পগুলো বাতাসে মিলিয়ে দিই।’
আমি চুপ হয়ে গেলাম। তারপর বললাম, ‘তোমার কি কখনো একা লাগে?’
গাছটি যেন আবারও দুলে উঠল। বলল, ‘না। আমার আছে মাটি, আকাশ, বাতাস, পাখি আর তোমাদের মতো পথিকরা।’
ভাবছি— একটি দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষকে ছায়া দেয়। অথচ পৃথিবী বদলায়। মানুষ বদলায়। সম্পর্ক বদলায়। কিন্তু গাছটি? বদলায় না। আমাদের বুকে টেনে নেয়। পাখিদের আশ্রয় দেয়। বাতাস পরিষ্কার রাখে। বিনিময় কিছুই চায় না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এবার বিদায়ের পালা। আমি গাছটির কাণ্ডে হাত রেখে বললাম, ‘ভালো থেকো। আবার আসব তোমার ছায়ায়।’
পাতাগুলো তখন ঝিরঝির করে উঠল। মনে হলো, গাছটি বলছে, ‘এসো। মানুষের ভিড়ে যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলবে, তখন আমার কাছে এসো। আমি কথা না বলেও তোমাকে অনেক কথা শুনিয়ে দেব।’ আসলে গাছই মানুষের ক্লান্তি বোঝে। কষ্ট বোঝে।







