সুতরাং

ঢাকায় ইদানীং ট্রাফিক আইন মানার চেয়ে অমান্য করার এক অভূতপূর্ব ‘হিড়িক’ পড়েছে। আসলে আমরা ঢাকাবাসী বরাবরই একটু বৈচিত্র্য ও রোমাঞ্চপ্রিয়। প্রতিদিন সোজা পথে জ্যামে বসে ঝিমানোর চেয়ে, উল্টো পথে শাঁইশাঁই করে গাড়ি চালিয়ে একটা মিনি হার্ট অ্যাটাকের স্বাদ নেওয়া— এ তো এক পরম অ্যাডভেঞ্চার!
আজকাল ঢাকার রাস্তায় লাল বাতি জ্বললে গাড়ি থামানোকে অনেকে চরম অপমান মনে করেন। ট্রাফিক পুলিশ ভাই মোড়ে দাঁড়িয়ে সজোরে বাঁশি বাজাচ্ছেন আর হাত উঁচিয়ে ‘স্টপ’ ইশারা করছেন। কিন্তু আমাদের বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের কাছে ওই ইশারার অর্থ ভিন্ন। বাসচালক মফিজ মিয়া তখন হেলপারকে বললেন, ‘মামা, পুলিশ ভাই তো হাত নাড়ায়া হাই-হ্যালো জানাইল, স্পিড আরও বাড়া!’ ব্যস, লাল বাতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাড়ি তখন রকেটের গতিতে ছোটে।
জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়াটাও বড্ড সেকেলে ফ্যাশন। ফুটওভার ব্রিজ থাকতেও চলন্ত বাসের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়ার মধ্যে যে অলিম্পিক লেভেলের রোমাঞ্চ আছে, তা এই যান্ত্রিক শহরে আর কোথায় মিলবে?
মোটরসাইকেলের চালকদের তো রানওয়ের দরকারই হয় না; ফুটপাত পেলেই তারা সেটিকে নিজেদের ব্যক্তিগত হাইওয়ে বানিয়ে ফেলেন। পথচারীরা ফুটপাতে হাঁটবেন— এমন অবাস্তব দাবি তো আর এই আধুনিক যুগে খাটে না! আর ট্রাফিক পুলিশ ভাইয়েরা যখন আইন ভাঙার দায়ে কোনো চালককে ধরেন, তখন শুরু হয় আরেক নাটক। চালক কাঁচুমাচু মুখে বলেছেন, ‘স্যার, একটু ভুল হয়া গেছে, মানিব্যাগটা বাসায় ভুইলা রেখে আসছি।’ পুলিশ ভাইও তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মামলা দিলে তো অনেক ঝামেলা, তার চেয়ে পকেটে যা আছে দিয়া কাগজ নিয়া যান!’ চালকের পকেট থেকে ‘কাগজপত্র’ হিসেবে তখন যে রঙিন নোটগুলো বের হয়, তা তো ট্রাফিক ব্যবস্থার এক অনন্য ডিজিটাল বিবর্তন!
ডিএমপি অবশ্য সিসিটিভি আর এআই ক্যামেরা বসিয়ে ঘরে ঘরে মামলার নোটিস পাঠাচ্ছে। কিন্তু তাতে কী? নোটিস জমিয়ে রাখার মধ্যেও তো একটা রাজকীয় ব্যাপার আছে। আসলে আইন মেনে চললে শহরটা বড্ড নীরস আর সুবোধ হয়ে যাবে। সুতরাং ঢাকার রাস্তা সচল রাখতে নয়; বরং নিজেদের আইনি ‘সাহস’ ও রোমাঞ্চ টিকিয়ে রাখতেই যেন ঢাকাবাসী ট্রাফিক আইন অমান্যের এই মহোৎসবে মেতে উঠেছে!



