লজ্জাবতী বানরের মৃত্যু এবং চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎ

সংগৃহীত ছবি
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী- ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’- কর্তৃক প্রকাশিত সমীক্ষায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত বেঙ্গল লজ্জাবতী বানরের ৯টির মধ্যে ৭টিই মারা যাওয়ার উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই দুঃখজনক সংবাদ বন্যপ্রাণীর বেঁচে থাকার পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বন্যপ্রাণী হত্যা করা অথবা রোগে মারা যাওয়া এক ধরনের দুঃখজনক অধ্যায়। কারণ মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী প্রকৃতির ভারসাম্যকে রক্ষা করে চলেছে। সুন্দরবনের প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার কারণে বাঘ, সিংহের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে চলতে না পারায় বন্যপ্রাণী রহস্যজনকভাবে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ছে। লজ্জাবতী বানরের মতো অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে বনের পশুপাখিকে বন্দি করে নিয়ে খাঁচার ভিতর আবদ্ধ করা এবং মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য সংরক্ষণ করা হয় চিড়িয়াখানাগুলোতে। প্রাচীনকালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষ বন্যপ্রাণীকে নিজস্ব আঙিনায় অথবা বনে বন্দি করে রাখতো শখের বশে। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন লোক একত্রিত হয়ে চিড়িয়াখানা গড়ে তোলে।
পৃথিবীর প্রথম চিড়িয়াখানা গড়ে উঠে চীনে ১১৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৭৯৩ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বিশ্বের প্রথম চিড়িয়াখানা স্থাপিত হয়। পৃথিবীর কয়েকটি বিখ্যাত চিড়িয়াখানা হলো রিজেন্ট পার্ক লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ন্যাশনাল জুওলজিক্যাল পার্ক, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র, জুও গার্ডেন, রাশিয়া প্রভৃতি। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ চিড়িয়াখানা মিরপুরে অবস্থিত। ১৯৫০ সালে হাইকোর্ট চত্বরে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। ২১৩.৪১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চিড়িয়াখানাটি ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয়। চিড়িয়াখানাটিতে বাঘ, সিংহ, জলহস্তী, বানর, পাইথন, জেব্রা, এমু, গয়াল, কালো ভাল্লুক, চিতা, হায়না, পাখি, ঘড়িয়ালসহ দুর্লভ প্রাণী ও পাখির অবস্থান আছে। প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করে। পশুপাখিদের নিরাপদ স্থান থেকে নিয়ে এসে বন্দি করে খাঁচায় ভরে তাদের যাতে কষ্ট দেওয়া না হয় তার জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ভালোভাবে দিতে হবে। কারণ মাঝে মাঝে পশুপাখির মৃত্যুর ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে থাকে এটা দুঃখজনক।
নগর জীবনের স্টাইল পরিবর্তনের ফলে মানুষের চিত্ত চাহিদা পরিবর্তিত হয়। মানুষ স্থূল বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হতে পারে। তবে পশুপাখির সংস্পর্শে আসলে এবং তাদের সাথে খেলা করলে চিত্ত সুন্দর হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই দেশে চিড়িয়াখানা স্থাপন এবং বিদেশ থেকে দুর্লভ প্রাণী আমদানি করে চিড়িয়াখানার দৈর্ঘ্যকে বাড়িয়ে তোলা যায়। পশুপাখির সাথে মানুষের আচরণ যাতে খারাপ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য হলো, ‘খাঁচার ভিতর বন্দি বাঘের চেয়ে মুক্ত স্বাধীন গাধা অনেক ভালো।’ খাঁচার ভিতর বন্দি পশুপাখি যাতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে কষ্ট অনুভব না করে, তারা যাতে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একটা কথা আছে- ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ কিন্তু বনের পশু যদি ধরে নিয়ে খাঁচায় ভরা হয় তাহলে তাকে অধিকার বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু তাদেরকে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসবাসের জায়গা এমনভাবে দিতে হবে যাতে তারা স্বচ্ছন্দে চলতে পারে। শিশুরা চিড়িয়াখানায় যেয়ে বেশি আনন্দ পায়। হিংস্র প্রাণী থাকে বন্দি অবস্থায়। তাদের সাথে খেলা করতে উৎসুক হয়। হিংস্রতা আর প্রাণীর থাকে না। তারা থাকে বন্দি অবস্থায়।
চিড়িয়াখানার গেটে টিকিটের ব্যবস্থা থাকে। টিকিট কেটে তারপর ভিতরে ঢুকতে হয়। কিন্তু টিকিটের মূল্য যাতে উচ্চতর না থাকে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। কারণ এটা পশুপাখির সৌন্দর্য উপভোগ করার একটা সুযোগ যেখানে নিজের পশুত্বকে দমিয়ে রেখে পশুদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ থাকে। ছাত্র-ছাত্রীদের পশুপাখি নিয়ে গবেষণার জায়গাটিও রাখতে হবে।
চিড়িয়াখানা হলো কৃত্রিম স্থান যেখানে মানুষ যায় এবং পশুপাখিদের সংস্পর্শে আসে। এই কৃত্রিম স্থানটিকে অকৃত্রিম করে তুলতে হবে। যাতে তারা নির্মল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। মানুষ হলো সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ প্রাণী। তার যেমন আছে পশুত্বের দিক তেমনি আছে আত্মিক দিক। পশুত্ব দিয়ে পশুকে না দেখে মনুষ্যত্ব দিয়ে পশুকে দেখতে হবে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নইলে শ্রেষ্ঠ জীবের মর্যাদা হারাবে মানুষ। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি জগতের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে চলেছে। এই সৌন্দর্য উপভোগ করার মাধ্যমেই আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ জীবের পরিচয় দিতে হবে। চিড়িয়াখানায় সকল প্রাণী সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকুক আজকের দিনে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তার জন্য পশুপাখিদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের প্রতি নির্দয় না হয়ে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের অবস্থান উন্নত হোক এবং লজ্জাবতী বানরের মতো যাতে মৃত্যুবরণ না করে এই কামনা করা যাচ্ছে আন্তরিকভাবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, প্রভাষক দর্শন বিভাগ সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
E-mail:- [email protected]



