এবং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় বেইলি রোডে সন্ধ্যা নামত না, মহড়া নামত। রাস্তার বাতি জ্বলার আগেই নাট্যকর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়ে যেত। কারও হাতে নাটকের স্ক্রিপ্ট, কারও হাতে চা-কফির পেয়ালা, আর কারও হাতে কিছু না থাকলেও মুখে থাকত নাটকের সংলাপ।
নব্বইয়ের দশকের বেইলি রোড ছিল বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের একরকম অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ক্লাস হতো চায়ের দোকানে, পরীক্ষা হতো মঞ্চে, আর ফলাফল বের হতো দর্শকের হাততালিতে। কে কোন নাটকে অভিনয় করছেন, কোন দল নতুন নাটক নামাচ্ছে, কার প্রেমে কে পড়েছেন— সব খবর পাওয়া যেত এক কাপ চায়ের সঙ্গে। বিনোদন সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য চায়ের দোকানে কান পেতে থাকতে হতো। চায়ের দোকানগুলো যেন একেকটি তথ্যভাণ্ডার! সেখানে বসলে মনে হতো, দেশের নাট্যচর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় সেমিনার চলছে। একজন বলছেন, ‘বাংলাদেশের নাটকে নতুন ভাষা দরকার।’
আরেকজন চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে বলছেন— ‘আগে বিলটা দাও, তারপর ভাষা নিয়ে কথা বলো।’
কেউ নাটকের চরিত্র নিয়ে তর্ক করছেন, কেউ নির্দেশকের সঙ্গে অভিমান করে বলছেন, ‘আমি আর এই নাটকে থাকব না। পাঁচ মিনিট পর আবার প্রশ্ন— ‘আজ মহড়া কয়টায়?’ মানে সারাক্ষণ নাটক নিয়েই আলোচনা হতো।
আর প্রেম? সেটিও ছিল নাট্যপাড়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মঞ্চে নায়ক-নায়িকা প্রেমে পড়তেন চরিত্র অনুযায়ী, আর মঞ্চের বাইরে অনেকেই পড়তেন নিজের দায়িত্বে। ফলে কোনটা নাটকের মহড়া আর কোনটা বাস্তব জীবনের মহড়া— তা বুঝতে দর্শকের চেয়েও নাট্যকর্মীদেরই বেশি কষ্ট হতো!
বেইলি রোডের নাট্যপাড়ায় তখন একটা অদ্ভুত জৌলুস ছিল। সন্ধ্যার পর মনে হতো, সাংস্কৃতিক রাজধানী বুঝি এটাই। পকেটে টাকা নেই, কিন্তু স্বপ্নের কোনো ঘাটতি নেই।
তারপর সময় বদলেছে। শহর বদলেছে। আড্ডার ধরন বদলেছে। মোবাইল ফোন এসেছে, ফেসবুক এসেছে। গণমাধ্যমের প্রভাবে রাজধানীর এমন আড্ডাগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে।
বেইলি রোডও তার পুরনো রূপ হারিয়েছে। তরুণ-তরুণীদের সেই জটলা আর নেই, রাতভর নাটক নিয়ে তর্ক নেই, চায়ের কাপ হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে বসে থাকা মানুষও আর নেই।
সেদিন গিয়েছিলাম বেইলি রোডে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো রাস্তা যেন খুব আস্তে করে বলে ওঠে— ‘একসময় এখানে নাটক হতো’ আর বেইলি রোড তখন মুচকি হেসে উত্তর দেয়— ‘হতো? আরে ভাই, এখানে তো জীবনটাই নাটক ছিল!’



