তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
—‘হ্যালো... জীম?’
একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো।
—‘না, আংকেল। আমি একজন টিচার।’
‘টিচার? এ ফোন আপনার কাছে কেন? জীম কোথায়?’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন— ‘আংকেল, আপনার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ফোনটা খিলগাঁও থানার সামনে আহত শিক্ষার্থীদের পাশে পেয়েছি।’
‘মানে! গুলিবিদ্ধ? ও এখন কোন হাসপাতালে?’
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে অসহায়ের মতো উত্তর দিলেন— ‘জানি না, আংকেল। খিলগাঁও তালতলার আশপাশের কোনো হাসপাতালে খুঁজে দেখতে পারেন।’
তখন এর বেশি কিছু বলার ছিল না আমার। ফোনটি তার কাছে রেখে দিতে বলে কল কেটে দিলাম।
মুহূর্তেই বুঝে গেলাম, ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে। একজন বাবার জীবনে ওই মুহূর্তের হাহাকার সহজেই অনুমেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিকাল ৫টা ২০ মিনিট। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। উত্তাল ঢাকা। চারদিকে সংঘর্ষ, গুলির শব্দ আর আতঙ্কের খবর।
সেদিন সকালেই আমি বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছেলে জাওয়াদ জাবির খান জীমকে বারবার বলে এসেছিলাম, যেন কোনোভাবেই বাইরে না যায়। দুপুরেও ফোন করে নিশ্চিত হয়েছিলাম, সে বাসাতেই আছে। কিন্তু শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। তখনো খিলগাঁও থানা ঘিরে রেখেছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। চারপাশে চলছিল পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ আর গুলির শব্দ।
বিকাল ৫টার দিকে আমি তেজগাঁও থেকে রওনা দিই। কলোনি বাজার হয়ে তিব্বত মোড়ে পৌঁছাতেই সমকালে কর্মরত আমার স্নেহভাজন রফিকের সঙ্গে দেখা হয়। তার মোটরসাইকেলে চড়ে আমার তখনকার কর্মস্থল কারওয়ান বাজারে পৌঁছাই। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দিলাম।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে জীমকে ফোন করলাম। এরপরই শুনতে হলো সেই কয়েকটি বাক্য— যে বাক্যগুলো আমার জীবনের গতিপথ কিছুক্ষণের জন্য থমকে দিয়েছিল।
যাই হোক, অফিসে ঢুকে সবাইকে বলে বসে পড়লাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আবার নেমে এলাম বিএসইসি ভবনের নিচে।
দেখি, রাজধানীর রাজপথে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। সৃষ্টি হয়েছে এক ভিন্ন আবহ। দীর্ঘ আন্দোলনের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের খবরে তারা আনন্দে স্লোগান দেয়, একে অন্যকে আলিঙ্গন করে, বিজয়ের চিহ্ন দেখায়। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে হাসি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন দিনের স্বপ্ন আর বিজয়ের উল্লাস।
কিন্তু আমি? আমি বাকরুদ্ধ, ভাষাহীন এক বাবা। সামনে এগোতে পারছি না। হোটেল সোনারগাঁওয়ের সামনে গেলাম। কখন পৌঁছাব জীমের কাছে? পা চলছে না। রফিককে আবার ফোন দিলাম, আপনি কই? এক্ষুনি চলে আসেন, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ।
এরপরই আবার ওর মোবাইল থেকে ফোন— ‘হ্যালো আব্বু, আমি’।
—তুমি!
তুমি কোথায়?
‘বাসার সামনে আছি। ফোনটি হারিয়ে গিয়েছিল, এক আপু পেয়ে দিয়ে দিয়েছেন।’
এটি ছিল তার মিথ্যা কথা। আসলে খিলগাঁওয়ে মিছিলকারীদের সঙ্গে সে-ও ছিল। তখন তার মোবাইল হারিয়ে যায় এবং সেখানে পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত হন।
ভাবছি— সন্তান শুধু পরিবারের নয়, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা এবং জীবনের প্রতিটি সংগ্রামের নীরব প্রেরণা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ঘটনা কিছু না কিছু শেখায়। কিন্তু আমরা শিখি না।



