জন্মদিনে নিকানোর পাররা স্মরণ
প্রিয় পাররা, তোমাকে মনে রেখে

নিকানোর পাররা ( ৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৪ – ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮)
২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। সেদিন চিলির এক উপকূলীয় শহর লাস ক্রুসেসে থেমে গেল এক শতাব্দীজীবী নিঃশ্বাস। সারা জীবন হাঁপানিতে ভোগা এক মানুষ, যিনি কবিতাকে শিখিয়েছিলেন নতুন করে শ্বাস নিতে, তিনি চলে গেলেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিশ্বসাহিত্যের পাঠকরা বুঝতে পারলেন, প্রতিকবিতা বা এন্টিপোয়েট্রির জনক নিকানোর পাররা আর নেই। যে মানুষটি কবিতাকে ভেঙে নতুন করে গড়েছিলেন, যিনি ভাষার গতানুগতিক ছন্দকে চূর্ণ করে তৈরি করেছিলেন নিজের "রোলারকোস্টার"—তিনি কী করে থাকেন শুধুই স্মৃতিতে? তিনি থাকেন প্রতিটি সেরকম কবিতায়, যে কবিতায় পাঠক প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করেন কবিতা আদৌ যা আমরা মনে করে এসেছি, যা বলে মনে হয়, তা নয়।
নিকানোর পাররার কবিতা পড়ে প্রতিক্রিয়া না দেখানো অসম্ভব। এখানেই হয়তো তাঁর কবিতার শক্তিমত্তা। কবিতা পড়তে পড়তে মনে হতে পারে—এ আদৌ কবিতা নয়। এতদিন ধরে গড়ে ওঠা কবিতার ধারণাকে ভেঙে ফেলার জন্যই বুঝি এই কবিতা। প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়—যদি এগুলো কবিতা হয়, তাহলে আগে আমরা কবিতা নামে যা পড়েছি, সেসব কী? তিনি নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টির নামকরণ করে: প্রতিকবিতা (ANTIPOETRY)। আর এই প্রতিকবিতা প্রকাশের সাথে সাথে বিশ্বকবিতায় সূচিত হয়েছিল এক নতুনের যাত্রা, যার গন্তব্য পৌঁছানো হয়তো কোনদিন শেষ হবে না।
১৯১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ চিলির এক ছোট্ট শহরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির পুরো বংশানুক্রমিক নাম নিকানোর পাররা ওইয়ুন্দো দে সান ফাবিয়ান দে আলিকো। আট ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় পাররার শৈশব কেটেছে আর্থিক অনটন আর বাবার বদলির চাকরির কারণে একপ্রকার ভবঘুরের মতো। ১৬-১৭ বছর বয়সে তিনি একলা পাড়ি জমান রাজধানী সান্তিয়াগোর উদ্দেশ্যে। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে যান, কিন্তু সাহিত্য নয়—তিনি ভর্তি হন চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণিত ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর বলবিজ্ঞান (Power Dynamics) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। দীর্ঘকাল তিনি ছিলেন গণিত আর পদার্থবিদ্যার শিক্ষক, চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। এই বিজ্ঞানমনস্কতাই হয়তো তাঁকে শিখিয়েছিল বাস্তবতাকে কোনোরকম অলংকার ছাড়া দেখতে— আর সেটাই তিনি প্রয়োগ করলেন কবিতায়।
১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ Cancionero sin nombre বা 'নামহীন গীতিমালা'। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের গতিপথ বদলে দেওয়ার আসল ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৪ সালে, Poemas y Antipoemas , বা 'কবিতা ও প্রতিকবিতা' প্রকাশের মাধ্যমে। বইটি হাতে নিয়ে অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন। চিলির প্রখ্যাত কবি পাবলো দে রোকা লিখেছিলেন, 'এই সব স্থুল, বদখৎ, গোঁয়ার, অলস জোড়গুলো, মৈথুনের পূর্বপরিকল্পনা আর সচেতনভাবেই যাদের জীববিদ্যা আর উদ্ভিদবিদ্যা থেকে টেনে আনা হয়েছে। এই বিষম প্রতিকবিতাগুলো করুণাযোগ্য আর বমিজাগানো ভাঁড়ামোরই দ্বিতীয় সংস্করণ।' গির্জার অধ্যক্ষ ফাদার সালভাতিয়েরার প্রতিক্রিয়া ছিল আরও কঠোর—তিনি বলেছিলেন, এই বই এতই অনৈতিক ও নোংরা যে ময়লা ফেলার ডাস্টবিনেও ফেলা যাবে না। অথচ এদের একেবারে বিপরীতপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পাবলো নেরুদা ঘোষণা করলেন, 'নিকানোর পাররা আমাদের ভাষার মহত্তম নামগুলির অন্যতম'। এই বিতর্কই প্রমাণ করেছিল পাররা কিছু একটা করছেন—এমন কিছু যা সাহিত্যজগতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি লিখেছিলেন:
আধা শতাব্দী ধরে
কবিতা ছিলো বেহেস্ত
গুরুগম্ভীর সব বেকুবদের জন্যে
যতক্ষণ-না আমি এসে হাজির হলাম
আর তৈরি করলাম আমার রোলারকোস্টার।
ওঠো, চলো, যদি তোমার ইচ্ছে হয়।
এতো আর আমার দোষ নয় যে তুমি হুমড়ি খেয়ে পড়েছো
আর তোমার নাকমুখ দিয়ে দরদর ক'রে রক্ত বেরুচ্ছে।
(প্রতিকবিতা/ নিকানোর পাররা/ অনুবাদ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
পাররার প্রায় প্রতিটি কবিতাই খাপখোলা তলোয়ারের মতো। কবিতা, ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, রাজনীতি—সবকিছুকেই তিনি সেই তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন। কিন্তু সেই আঘাত যেন মধুময়, রসসিক্ত। বার্নার্ড শ'-র সেই উক্তির মতোই— চূড়ান্ত অপমান করার সময়ও চূড়ান্ত রসিক হতে হবে। পাররার কবিতায় আঘাত আর রসবোধ পরস্পরের জন্য জায়গা করে নেয়। তিনি অবলীলায় শ্ল্যাং ব্যবহার করেন, কিন্তু সেগুলো আর শ্ল্যাং থাকে না, হয়ে ওঠে কবিতারই অন্য রূপ:
কোনো প্রার্থনা চলবে না, হাঁচিও না।
থুতু ফেলা নয়, বাহবা দেওয়া নয়, হাঁটু গেড়ে বসা নয়,
পুজা না, চিৎকার না, ঠুকরে ওঠা না,
কেশে কেশে কফ তোলা না
এ তল্লাটে ঘুমোবার অনুমতি নেই।
কোনো টিকা না, কথাবার্তা না, দল থেকে বহিষ্কারও না।
ভোঁ দৌড় না, পাকড়ে ফেলা না।
ছোটা একেবারেই মানা।
ধুমপান নিষেধ। যৌনসঙ্গমও।
(হুশিয়ারি/ নিকানোর পাররা/ ইংরেজি থেকে অনুবাদ: শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
এই "হুঁশিয়ারি" কবিতাটি পড়লে মনে হবে খাপছাড়া এক মানুষের লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটার মতো—আপাত বিশৃঙ্খল, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপই সুনির্দিষ্ট। মেদহীন ঝরঝরে আপাত-রসিক কবিতাগুলো একেকটি অব্যর্থ তীর। তিনি প্রচুর জাম্পকাট ব্যবহার করেন, পাঠককে কোনো আরামদায়ক ছন্দে বসতে দেন না। তিনি চান পাঠক জেগে থাকুক, ভাবুক, প্রশ্ন করুক।
নিকানোর পাররা বিশ্বকবিতার সেই নিরীক্ষাধর্মী ধারার প্রতিনিধি, যেখানে আছেন মিরোস্লাভ হোলুব, তাদেউশ রোজেভিচ, কার্লোস ড্রুমন্ড ডি আন্দ্রাদে, অরহান ভেলি কানিক, ফের্নান্দো পেসোয়া, বোর্হেস, ইতাল কালভিনোর মতো কবিরা। ভিন্ন ভিন্ন দেশে বসে এঁরা যে সমান্তরাল পথে হেঁটেছেন, তা বিস্ময়কর। যেমন জার্মান গল্পকার পিটার বিকসেলের এক গল্পে নায়ক সবকিছুর নাম বদলে দিতে থাকে, একসময় এমন এক ভাষা তৈরি করে যা কেউ বোঝে না—সে ভাবে, আজ সে সফল। পাররার "নামবদল" কবিতায়ও সেই একই প্রশ্ন:
কোন্ কারণে সূর্যকে
চিরকাল সূর্য বলে ডাকা হয়?
আমি বলি তাকে ডাকা হোক
চল্লিশ সাইজের জুতোর বিল্লি বলে।
আমার জুতোগুলোকে
কফিনের মতো দেখাচ্ছে বুঝি?
জেনে রাখুন আজ থেকে
জুতোকে বলা হবে কফিন।
(নামবদল/ নিকানোর পাররা/ইংরেজি থেকে অনুবাদ: শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
আপাত-নিরীহ এই কবিতাগুলো আসলে নিরীহ নয়। লাতিন আমেরিকার কোনো সচেতন শিল্পই সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনামুক্ত হতে পারে না। শতকজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সেখানে গেড়ে বসেছিল—কখনো সরাসরি, কখনো তাবেদার সরকারের মাধ্যমে। চিলিতে সেই অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাররা লিখেছিলেন:
আমেরিকা
যেখানে স্বাধীনতা একটা মূর্তি
(মূর্তি/ নিকানোর পাররা/ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
নিকানোর পাররা কখনো সরলপথে হাঁটেননি। ১৯৭০ সালে, ফিদেল কাস্ত্রোর সমর্থক হয়েও তিনি ওয়াশিংটনে লেখকসভায় গিয়ে হোয়াইট হাউজে প্যাট নিক্সনের চা-চক্রের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই সঙ্গিন (পড়ুন রিস্কি) সময়ে এই সিদ্ধান্তের জন্য কিউবার 'কাসা দে লাস আমেরিকাস' সংগঠন তাঁকে জুরির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়, অপমান আর কটুক্তি করতেও ছাড়েনি। আবার ১৯৭৩ সালে মার্কিন মদদে সালভাদর আইয়েন্দেকে হত্যা করে জেনারেল পিনোশে সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করার পর পাররাকে বেশ কিছুদিন নির্বাসনে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। তাঁর ভাইপো আনহেল পাররা ফ্রান্সে পালিয়ে যান, ভিক্তর হারাকে সান্তিয়াগোর ফুটবল মাঠে খুন করা হয়—প্রথমে গিটার বাজানোর হাত কেটে ফেলে, পরে গুলিতে ঝাঁঝরা করে। তাঁর বোন ভিওলেতা পাররা, লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা সংগীতশিল্পী, আত্মহত্যা করেছিলেন। এই রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পাররার কবিতা ছিল প্রতিরোধের আরেক নাম—কখনো সরাসরি, কখনো বক্রভাবে, কখনো নীরবতায়।
তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকাশ করেননি—১৯৭৭ সালে পিনোশের শাসনামলে দুটি বই বের করার পর, ১৯৮৫ সালে পাররার পাতা সংকলন প্রকাশের পর, তারপর নীরবতা। ২০০৪ সালে এই নীরবতা ভাঙেন শেক্সপীয়রের কিং লিয়ার-এর এক অসাধারণ স্প্যানিশ অনুবাদ দিয়ে। সমালোচকদের মতে স্প্যানিশ ভাষায় এটিই এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ কিং লিয়ার। প্রকাশক মাতিয়াস রিভাসের কথায়, "লিয়ার বেরুবার পর পাররা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী তার পিছু নেয়। রাতারাতি রকস্টার বনে গিয়েছিলেন তিনি।"
নিকানোর পাররা সত্যিই সত্যিই সাধারণ মানুষের কথা লিখে রাখতেন। তাঁর নাতি টলোলোর গল্প—যে ক্লাসে রোলকলের সময় নিজের নাম ক্রিস্তোবালের বদলে হ্যামলেট বলেছিল—শুনে পাররা বলেছিলেন, "ওর ঐ জবাব শোনার পর থেকে আমি সাহিত্য লেখা ছেড়ে দিয়েছি, বাচ্চাকাচ্চারা কী কী বলে সেটা লিখতেই আমার সবটুকু সময় চলে যায়।" কথাটা ইয়ার্কির মতো শোনালেও তিনি মোটেও ঠাট্টা করছিলেন না। তাঁর বাড়ি পরিষ্কার করতে আসা রোসিতা আবেন্দানোর কথাও তিনি কবিতায় তুলে এনেছিলেন:
পরে আমাকে ওরা ঐ স্কুলে পাঠাতে চেয়েছিল
যেখানে অসুস্থ বাচ্চাগুলো থাকে
তবে আমি ওদের কথা শুনিনি
কারণ আমি তো কোনো অসুস্থ মেয়ে নই
এমন করে আমি বলতে চাই না
কিন্তু আমি তো একদমই অসুস্থ মেয়ে নই।
(রোসিতা, নিকানোর পাররা/ অনুবাদ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
লাস ক্রুসেসের সেই বাড়িটির কথা মনে পড়ে—যেখানে দরজার ওপাশে হলঘরে ছেলে-মেয়েদের নাম আর ফোন নম্বর লিখে রাখতেন কবি, যেখানে পাড়ার মাস্তানরা স্প্রে-ক্যান দিয়ে দেয়ালে লিখে রেখেছিল 'anti-poesia', যেন বহিরাগতদের জন্য এক সতর্কবার্তা: এই বাড়ির কর্তাকে যেন কেউ জ্বালাতন না করে। সেখানে বসেই তিনি লিখতেন—সাধারণ সাদা নোটখাতায়, সাধারণ বলপয়েন্ট পেন দিয়ে। পরনে জিন্সের শার্ট, হালকা ধূসর সোয়েটার (তাতে আবার কয়েকটি ফুটো), কর্ডের প্যান্ট। চুল শ্বেত-শুভ্র, গালভরা দাড়ি, মুখে যেন মাটির গভীর খাঁজ। হাত দুটো সূর্যে পুড়ে তামাটে, কোনো দাগ নেই, ভাঁজ নেই—যেন জলে ধোয়া গাছের দুটো শেকড়।
তিনি নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য কয়েকবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন, ২০১১ সালে জিতেছিলেন স্পেনের সের্ভান্তেস পুরস্কার। একবার স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক টিভি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে শাকিরার সমান সম্মানী দাবি করেছিলেন—শোনা যায়, আধ-মিনিটের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ত্রিশ হাজার ডলার। তাই মজা করে বলতেন, তাঁর রেট মিনিটপ্রতি হাজার ডলার। অথচ নিজের জন্য জামা-কাপড় কিনতেন সেকেন্ড-হ্যান্ড দোকান থেকে। তাঁর এই বৈপরীত্যই ছিল তাঁর কবিতারই সম্প্রসারণ—উঁচু-নিচুর, পবিত্র-অপবিত্রের, গভীর-অগভীরের এক অদ্ভুত মিশেল।
তিনি লিখেছিলেন:
খুব বুদ্ধিমান না, নিরেট গর্দভও না
আমি যা, তাই ছিলাম: মিশ্রণ
তেল আর ভিনেগারের, যা দিয়ে খাওয়া যায়
দেবদূত আর দানবের সসেজ।
(মধ্যহ্নভোজ, নিকানোর পাররা/ অনুবাদ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
আরও লিখেছিলেন:
কল্পনার মানুষটি
থাকে কাল্পনিক এক অট্টালিকায়,
কাল্পনিক গাছে ঘেরা
কাল্পনিক এক নদীতীরে।
(কাল্পনিক মানুষ, নিকানোর পাররা/ অনুবাদ শিমুল সালাহ্উদ্দিন)
এই "কাল্পনিক মানুষ" কবিতাটি লেখা হয়েছিল আনা মারিয়া মোলিনারে নাম্নী এক নারীর স্মৃতিতে, যিনি কবিকে ছেড়ে চলে যাওয়ার তিন বছর পর আত্মহত্যা করেছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে কমবেশি একাই ছিলেন কবি। লিখেছিলেন:
আমার আসলে প্রয়োজন
একজন মারিয়া কোদামা
যে আমার লাইব্রেরিটা গুছিয়ে রাখবে।
শেষ বয়সে এসে তিনি ছিলেন খামখেয়ালি এক খ্যাপাটে বুড়ো—কিন্তু সেই খ্যাপামির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল গভীর এক প্রজ্ঞা। মৃত্যুকে নিয়ে তাঁর আক্ষেপ ছিল বিজ্ঞানীর মতো:
"মানুষ এত কিছু করে ফেলেছে, বুঝে ফেলেছে, কিন্তু এই একটা জিনিস তারা এখনো ঠাহর করে উঠতে পারল না।"
"কোন জিনিস?"
"মৃত্যু। অন্যান্য জিনিস ঠাহর হয়ে গেছে। কিন্তু মৃত্যুকে আরো বেশি মনোযোগ দেয় না কেন ওরা?"
নিকানোর পাররা মৃত্যুকে মনোযোগ দিয়েছিলেন ঠিকই—কিন্তু তাঁর নিজের মতো করে। মৃত্যুকে তিনি দেখেছিলেন আরেকটি প্রতিকবিতার মতো: এমন এক বাস্তবতা, যাকে কোনো অলংকারে ঢাকা যায় না, কোনো ছন্দে গোছানো যায় না। ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন তিনি। হাঁপানিতে ভোগা এই মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু তিনি কি সত্যিই চলে গেছেন? যে কবিতা আজও পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়—"কবিতা আসলে কী?"—সে কবিতা কি কখনো মরে? যে মানুষটি বলেছিলেন, "আমার মনে হয় যে আমি আসলে কখনোই সেভাবে কিছু লিখিনি—বরং সব সময় যেটা করে এসেছি, স্রেফ হাওয়া থেকে শব্দ তুলে এনেছি"—সেই মানুষটির ম্যাজিকের মতো তুলে আনা শব্দগুলো কি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে?
হয়তো না। কারণ কবিতার ইতিহাস এখনো পাররার আগে-পরে ভাগ করা যায়। বলাই হয়ে থাকে, কবিতা এখন কোথায় সেটা জানতে গেলে প্রতিকবিতা পড়তে হবে। আর প্রতিকবিতা মানেই নিকানোর পাররা। ভবিষ্যতের কবিতার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি নতুন নিরীক্ষার ভেতরে, প্রতিটি পাঠকের চমকে ওঠা চোখে তিনি থাকবেন—তাঁর রোলারকোস্টারে চড়ে যাঁরা হুমড়ি খেয়ে পড়বেন, তাঁদের নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরুবে, তবু তাঁরা উঠে দাঁড়াবেন আবার চড়ার জন্য। কারণ এ রোলারকোস্টারের নেশাটাই আলাদা।
প্রিয় পাররা, তোমাকে মনে রেখে—তোমার সেই "চল্লিশ-সাইজের জুতোর বিল্লি"র কাছে, তোমার "কফিন" নামক জুতোর কাছে, তোমার "নামহীন" থেকে "প্রতি" হয়ে ওঠা কবিতার কাছে, আর সর্বোপরি তোমার সেই হাসিমুখের কাছে, যে হাসি দিয়ে তুমি কবিতার গরুগম্ভীর বেহেস্ত ভেঙে তৈরি করেছিলে আমাদের জন্য এক রক্তাক্ত, জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাসে ভরা পৃথিবী। টুপি খোলা অভিবাদন, নিকানোর পাররা। শুভ জন্মদিন।










