জীবন্ত সেতুর মতো বাঁচা

কেতকী কুশারী ডাইসন (২৬ জুন ১৯৪০ — ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
ক্যালেন্ডারের হিসাবে সময়টা যখন শরৎকালের দিকে পা বাড়িয়েছে, তখন হঠাৎই একপশলা বৃষ্টির পর সিসে রঙের বিষণ্ণ বিকালে লিখতে বসে কত কথা মনে আসছে...। কেতকী কুশারী ডাইসন, এপার-ওপার দুদিকের বাংলা বিদ্যাজগতে এক পরিচিত, সম্ভ্রম জাগানো নাম, কিন্তু আমার এবং আমার পরিবারের সবার কাছে তিনি ‘কেতকীদি’। ২০০৩ সালে তার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হয়, একটি লেখার সূত্র ধরে তিনিই আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন এবং চিঠি লিখেছিলেন। আজ পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি সেটি ছিল আমার জীবনের মোড় বদলে দেওয়ার ঘটনা।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই তার সঙ্গে আলাপের আগেই যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি পিএইচডির জন্য গবেষণা করছিলাম, কিন্তু সত্যিকারের গবেষণা কাকে বলে তা তার লেখা পড়ে, তাকে কাছ থেকে দেখে শিখেছি। ২০০৮ সালে ডায়াস্পোরার বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা এবং ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজে যখন অক্সফোর্ড যাই, তখন অক্সফোর্ডশায়ারের কিডলিংটন নামের ছোট্ট শান্ত জনপদে কেতকীর বাড়িতে কিছুদিন কাটানোর সুযোগ হয়েছিল।
অজস্র বইয়ে ঠাসা পড়ার ঘর, লেখার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা ডেস্কটপ কম্পিউটার ও কিবোর্ড, সামনে খোলা বাগানে নিজের মতো বেড়ে ওঠা গাছগাছালি— কোথাও ছিল না এতটুকু আড়ম্বর, ছিল শান্ত নিমগ্নতা এবং আভিজাত্য। চিনিয়েছিলেন হর্সচেস্টনাট, হানিসাকল, উইপিং উইলো গাছ, দেখিয়েছিলেন মাঠভরা দিগন্তবিস্তৃত জ্বলজ্বলে হলুদ রেপসিডের ক্ষেত, বুঝিয়েছিলেন কীভাবে ইংল্যান্ডের প্রকৃতি তার লেখার শিরায় শোণিতে মিশে আছে।
আবার তারই সঙ্গে জুড়ে আছে পেছনে ফেলে আসা দেশের স্মৃতিবাহী নানা অনুষঙ্গ। যেমন ‘বৃষ্টির পর’ কবিতায় ধরা একটুকরো ছবি। একপশলা বৃষ্টির পর হাঁটতে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল একটি গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন আর বনেটের গায়ে লেপ্টে থাকা একরাশ ফুল দেখে ধক করে ওঠে বুক, মনে হয় যেন শিউলি। কেন ধক করে ওঠে বুক? কারণ বাংলার একান্ত নিজস্ব এই ফুল শরতের অগ্রদূত হয়ে আসে, যে শরৎকাল প্রবাসীর ঘরে ফেরার ঋতু। তারপর মনে হয়, হতে পারে হর্সচেস্টনাটের ফুল, মিল আছে তার শিউলির সঙ্গে। কী এক দুরন্ত আগ্রহে কুড়িয়ে নিয়ে আসেন সেই ফুল মিলিয়ে দেখার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে সেই গাড়িটি চলে গেছে, উত্তর অমীমাংসিত রেখেই—
গাড়িটা চ’লে গেছে।/ আমার ঠাণ্ডা আঙুলগুলোর মধ্যে/ একমুঠো ভেজা ফুল/ ভালোবাসার ব্যথার মতো/ অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্।
(বৃষ্টির পর/কেতকী কুশারী ডাইসন)
দূরের দেশটা দূরেই থেকে যায়, হঠাৎ শরতের আভাস দিয়ে ইংল্যান্ডের ভেজা, ঠান্ডা বিকালে। শিউলি গন্ধের জন্য উন্মনা মনটাকে শান্ত করতে করতে, হর্সচেস্টনাট আর শিউলির মধ্যে মিল খোঁজার চেষ্টায় কেটে যায় অভিবাসী জীবন। কবিতাটি যে বইয়ের অন্তর্গত তার নাম ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’। এই নামের কবিতাটি যে ফুলটিকে নিয়ে, তার কাহিনি আবার এর উল্টো। এক নয়, একাধিক কবিতা আছে তার বাগানের এই গাছটি নিয়ে। প্রথম কবিতাটি যখন লেখা হয় ততদিনে দোলনচাঁপা বীরভূমের মাটি ছেড়ে দুবার প্লেন বদল করে অক্সফোর্ডের শহরতলির বাড়িতে উদ্যানপালিকার স্নেহ যত্নে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, বয়স হয়েছে সাত বছর। শীতে তার ডাঁটা-পাতা সমেত মাটির ওপরকার পুরো অস্তিত্বটাই বিলুপ্ত হয়ে যায়, থাকে শুধু একটা বোবা শিকড়। বসন্তে সেটিই আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে নতুন করে ডাঁটা পাতা দেখা দিলেও ফুল আর কিছুতেই ধরে না তাতে।
কেতকীর মনে সাধ ফুল ফুটলে সে খবর চিঠি লিখে জানাবেন বোলপুরের সান্ত্বনাকে, যে তাকে দিয়েছিল দোলনচাঁপার চারাগাছ, কারণ ‘দিয়রিসসিমো’ নামের ফরাসি সুগন্ধের আভাস তাকে দোলনচাঁপার গন্ধের কথা মনে করাত। ওই সুগন্ধটি মেখেই তো রবীন্দ্রনাথের ওপর কাজের সূত্রে লাইব্রেরিতে যাতায়াত করতেন কেতকী। শেষ পর্যন্ত বারো বছরের মাথায় ফুল আসে দোলনচাঁপায়। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের পরিবেশেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। গ্রীষ্মে প্রায় সাবট্রপিকাল আবহাওয়া। উষ্ণায়নের জন্য সন্দেহ নেই, কিন্তু গরম দেশের গাছের জন্য নিঃসন্দেহে তা অনুকূল। দুর্গাপূজার প্রতিটি দিন একটি করে ফুল উপহার দেয় দোলনচাঁপা, সারা দিন আমোদিত রাখে স্বর্গীয় সৌরভে। প্রবাসী জীবনে এর চেয়ে বড় শারদ উপহার আর কী-বা হতে পারে!
... এই কবিতায় মূলত একটাই খবর:
দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে
বাড়িতে আনার বারো বছর পরে।
বটানিকাল গার্ডেনের কাচঘরে—
দুর্লভ এক ক্যাকটাস ফুল দিলো এ বছর প্রথম।
শতাব্দীতে একবার সে ফুল ধরায়, তার পর মরে।
কাগজে কাগজে ছবি বেরিয়েছিলো তার।
আমার এই দ্বাদশী হারামজাদী চিরায়নানার
ছবি তো পৃথিবীর কোনো কাগজে বেরোবে না।
তবু কবিতার ইন্টারনেটে
থাকুক খবরটুকু।
ওর কোষে কোষে বারো বছর ধ’রে যে-ভাষা ঘুমিয়ে ছিলো
সে আজ জেগে উঠেছে, তার বাক্ এখন প্রকট।
যে-স্বরলিপি ও বইছিলো ওর ভাঁজে ভাঁজে
তা বাজনা হয়ে বেজে উঠেছে।
অমোঘ এক নিয়মে
নিহিত এক বার্তা ছাড়া পায় অনুকূল প্রতিবেশের ধাক্কায়,
আর তখন
আনন্দরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি—
আমার পক্ষে যথেষ্ট এই মিরাক্ল্।
(দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে)
দোলনচাঁপা গাছটি যেন লেখিকারই বিবর্ধিত সত্তা হয়ে ধরা দেয়। ১৯৬০ সালে কুড়ি বছর বয়সে দেশ ছেড়েছিলেন, অক্সফোর্ডে অধ্যয়ন শেষে কলকাতায় ফিরে এসে কিছুদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ডে তার সহপাঠী, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনকে বিয়ে করে ফিরে যান ব্রিটেনে। বাকি জীবন কয়েক বছরের সংক্ষিপ্ত কানাডার ভ্যাংকুবারে বসবাস বাদ দিলে কিডলিংটনে।
সেখানে সাধারণ কিন্তু অবিমিশ্র ব্রিটিশ জীবনের পরিসরের মধ্যে থেকে, ঘরকন্নার কাজ সামলে, ছেলেদের মানুষ করে, মার্গারেট থ্যাচারের ব্রিটেনে ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে লড়াই করে চালিয়ে গেছেন একটির পর একটি দাবিদার কাজ। সারা জীবনে কত অজস্র বিদেশি কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের সঙ্গে যে তিনি বাঙালি পাঠককে পরিচিত করেছেন তার বাংলা প্রবন্ধে, কোনো ইয়ত্তা নেই। কেতকীর গবেষণার বিষয়গুলো সবসময়ই আন্তর্বিদ্য।
সেক্ষেত্রেও বিষয়ের দাবি অনুযায়ী তিনি মাধ্যম হিসেবে ভাষা বেছেছেন। তিনটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগ্রন্থ, দুটি ইংরেজিতে, একটি বাংলায়। ‘A Various Universe : A Study of the Journals and Memoris of British Men and Women in the Indian Subcontinent 1705-1856.(1978), In Your Blossoming Flower Garden : Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’ (1988), ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিত্রকলায় রঙের ব্যবহার’ (১৯৯৭)। আবার একটি কাজ তাকে এগিয়ে দিয়েছে পরবর্তী কাজের দিকে। যেমন প্রথম বইটি কেতকীর ডক্টরেট গবেষণার কাজ। এর বিষয়বস্তু ছিল, ১৭৬৫-১৮৫৬, অর্থাৎ সিপাহি বিদ্রোহের পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতবর্ষে আসা ব্রিটিশ নরনারীদের ডায়েরি, ভ্রমণকাহিনি এবং স্মৃতিকথার ওপর।
এ মানুষগুলো নতুন দেশের খবরাখবর দিচ্ছেন তাদের লেখায়, জানাচ্ছেন নানা অভিজ্ঞতার কথা— গবেষণা করার সময়ই কেতকীর মনে হয়েছিল এর মধ্যে উপন্যাসের একটা ঘনত্ব আছে। সেই সম্ভাবনাই বীজের কঠিন আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসে যখন কেতকী তার প্রথম উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ (১৯৮০) নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন।
তার মনে হয়, A Various Universe এর পাত্রপাত্রীরা যা ভেবেছিলেন, অনুভব করেছিলেন বা প্রকাশ করেছিলেন, দেড়শ-দুইশ বছর পেরিয়েও তার সঙ্গে তার নিজের অবস্থানের একটা সমান্তরালতা রয়েছে। তিনি নিজেও অন্য দেশে এসে শিকড় নামিয়েছেন, সংসার, সন্তানপালন করছেন, সবচেয়ে বড় কথা তিনিও তার অভিজ্ঞতাগুলোকে নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেন— এর মধ্যে মৌলিক মিল রয়েছে কিছু কিছু।
তার দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ (১৯৮৫)-তে ফর্ম নিয়ে আরেক অভিনব নিরীক্ষা করলেন কেতকী। ১৯৮১ সালে নাভানা প্রকাশনার অধ্যক্ষ শ্রী বিরাম মুখোপাধ্যায় যখন তাকে রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া বিষয়ে কিছু লেখার জন্য অনুরোধ করেন, সেই সময় তার মধ্যে রূপ নিচ্ছিল একটি নতুন উপন্যাস। দুটি জঁরের দাবিই তিনি মেটানোর তাগিদ অনুভব করেন। কেতকী নিজে যে গবেষণা করেন সেটিই তিনি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনামিকাকে দেন।
অনামিকা একাধারে চিঠিপত্র, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা তথ্যসূত্র, প্রকাশিত গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকার ওপর আলো ফেলে এগোয়; খোঁজে রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়ার সম্পর্ক এবং তাদের অন্তর্জগৎ ও ব্যক্তিত্বের স্বরূপ— যা কি না রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ক্রমপরিণতিতে পৌঁছেছে; অন্যদিকে সে তার ব্যক্তিগত জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করে, ঔৎসুক্যের সঙ্গে আলাপ চালায় চারপাশের মানুষজনদের সঙ্গে এমনকি নতুন সম্পর্কের আহ্বানে সাড়া দিতেও দ্বিধা করে না। অনামিকার ব্যক্তিগত জীবন এবং গবেষণা স্বতন্ত্র দুটি ধারায় যাত্রা শুরু করলেও একসময় তারা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। যেন দুটি নদী আলাদা আলাদা খাতে বইতে শুরু করলেও একসময় পরস্পরের সঙ্গে মিলে গিয়ে অভিন্ন ধারায় এগিয়ে চলে সাগর সঙ্গমের দিকে। কোনো প্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ ছিলেন না বলেই হয়তো জ্ঞানের বিভিন্ন পরিসরে ছিল তার অপরিসীম আগ্রহ, শিশিক্ষু মনটি সজীব ছিল আজীবন। সেই কারণে চক্ষুবিশেষজ্ঞের লেখা একটি বৈজ্ঞানিক প্ৰবন্ধ তাকে এগিয়ে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টি নিয়ে গবেষণার দিকে।
রবীন্দ্রনাথ যে ‘প্রোটান’ ছিলেন, লাল এবং সবুজের মতো কিছু কিছু রঙকে যে ঠিকমতো দেখতে পেতেন না বা কিছুটা অন্যরকম দেখতেন, এ কথা জানার পর কেতকীর মনের মধ্যে যেন অনেক আলো একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, যে আলোয় তার রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠের ফেলে আসা পথটি নতুন করে চোখে পড়ে। যে পথের বাঁকে বাঁকে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকল্পগুলো ঘিরে তৈরি হওয়া নানা সংশয়। পাশে এসে দাঁড়ায় তার ছবির বিশ্ব, উজ্জ্বল, গাঢ়, প্রথাভাঙা রঙের অজস্র, ক্লান্তিহীন ব্যবহার। ব্যাপকতর অর্থে আন্তর্বিদ্য এ কাজে মিশেছে সাহিত্য, কলা এবং বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞতা। কেতকীর সহগবেষক ছিলেন কলাভবনের অধ্যাপক সুশোভন অধিকারী, রবার্ট ডাইসন এবং এড্রিয়ান হিল। সেই সঙ্গে এ কথাও আজ বলা প্রয়োজন যে, বিশ্বভারতী প্রথমে উৎসাহ দেখালেও পরে পিছিয়ে যায়, রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির সীমাবদ্ধতার ওপর মনঃসংযোগ তাদের কাছে সম্ভবত অবাঞ্ছিত ঠেকেছিল।
অদম্য জেদ এবং অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে সবরকম বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে, প্রায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মদদ ছাড়া (যেটুকু সাহায্য পেয়েছিলেন তা বিদেশের বন্ধুদের থেকে) বিপুলায়তন গবেষণাগ্রন্থ শেষ করেন আট বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে। এটি তাকে দ্বিতীয়বারের জন্য ‘আনন্দ পুরস্কার’ (১৯৯৭) এনে দিলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে রবীন্দ্রচর্চার কেন্দ্রগুলোতে এ কাজ সম্পর্কে অদ্ভুত নীরবতা আজও। কেতকীর শেষ বড় কাজ ‘তিসিডোর’ও মিশ্র জঁরের উপন্যাস। কথাসাহিত্যের কাঠামোর মধ্যে এখানে ধরানো আছে গবেষণা, চিঠিপত্রের পর্যালোচনা, স্মৃতিকথার টুকরো অনুবাদ, গ্রন্থসমালোচনা এবং ভ্রমণ। এখানে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেববিষয়ক অংশগুলো যেমন সম্পূর্ণ গবেষণা এবং পাঠভিত্তিক তেমন অনার পোপ, মার্গারেট ক্লার্ক বা মার্গারেট ডাও পুরোপুরি বাস্তব চরিত্র এবং স্বনামে উপস্থিত।
অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, কেতকী নাটকও লিখেছেন তিনটি। ‘রাতের রোদ’ (১৯৯০), ‘মোৎসার্ট চকোলেট’ (১৯৯৮) এবং ‘সুপর্ণরেখা’ (২০০১)। প্রচুর রাজনৈতিক, সামাজিক, লিঙ্গভিত্তিক বিতর্ক, পরিবেশ ভাবনা নাটকগুলোর মধ্যে গেঁথে দেওয়ায় বাঙালি দর্শকের কাছে বড্ড ভারী বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ‘রাতের রোদ Nights Sunlight’ নামে কেতকীর স্বকৃত অনুবাদে প্রকাশিত হওয়ার পর পাশ্চাত্যের বিদ্বমহলে অচিরে সমাদৃত হয়। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলসের জার্মানভাষী অধ্যাপিকা এটিকে ‘উপনিবেশোত্তর নারীবাদী’ টেক্সটের তালিকায় ঢোকান।
আবার তার দ্বিতীয় নাটক ‘মোৎসার্ট চকোলেটে’ বিলেতবাসিনী দুই বঙ্গনারী লিপি এবং ইলার কথোপকথনে ‘পোকোপোমো’ (পোস্ট কলোনিয়াল, পোস্ট মডার্ন) নিয়ে খুব একচোট ঠাট্টা করেন। সে প্রসঙ্গেই ইলা বলে তার ব্রিটেনবাসের দুটি পর্ব, ‘প্রি ফল’ ও ‘পোস্ট ফল’। এই ‘ফল’ অধঃপাতিত হওয়া অর্থে নয়, বাঙালি মেয়ের শাড়ির ‘ফল’ বা শাড়ির নিচের অংশে জোড়া কাপড়ের অংশ, যা শাড়িটিকে সহজে ছিঁড়ে যেতে দেয় না। অাবার সেই হালকা চলে কথা থেকেই ইলা পৌঁছে যায় তার স্মৃতিতে।
এক একটি শাড়ি যেন স্মৃতির অ্যালবাম হয়ে শুয়ে থাকে প্রবাসী মেয়ের ওয়ার্ডরোবে, বিশেষ মানুষদের উপহার, বিশেষ মুহূর্তের স্মারক, দেশ ছাড়ার আগের বা পরের। ইলার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যান তার স্রষ্টা, প্রিয় কবি বুদ্ধদেব বসুর ‘দ্রৌপদীর শাড়ি’ কবিতার মতো যার ভাঁজে ভাঁজে কোথাও পূর্ববঙ্গের মেহেরপুরে প্রথম শৈশবের স্মৃতি, ডায়সেশান স্কুল, লেডিব্রেবোর্ন কলেজে মেয়েদের সঙ্গে মিলে সংস্কৃত নাটক মঞ্চস্থ করা, প্রেসিডেন্সি কলেজের উজ্জ্বলতম ছাত্রী হিসেবে কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদনা যেখানে লেখেন সহপাঠী কিংবা সামান্য ছোট প্রণব বর্ধন কিংবা গায়ত্রী চক্রবর্তী, ‘সাহেব’কে বিয়ে করে দেশ ছাড়ার আগে বুদ্ধদেব বসুর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যে বাংলায় লেখা কখনো ছাড়বেন না।










