বিদায় কবি কেতকী কুশারী ডাইসন

কেতকী কুশারী ডাইসন- সংগৃহীত ছবি
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন মারা গেছেন। শুক্রবার ভোরে ইংল্যান্ডের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ভোরে থেমে যায় এই সাহিত্যিকের লড়াই।
তিনি রেখে গেছেন স্বামী রবার্ট ডাইসন এবং দুই ছেলে ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগর নীলাদ্রি ডাইসনকে। অক্সফোর্ডের শহরতলি কিডলিংটনে থাকতেন এই বহুভাষিক সাহিত্যিক।
১৯৪০ সালের ২৬ জুন কলকাতায় জন্ম কেতকী কুশারী ডাইসনের। পিতা অবনীমোহন কুশারী এবং মাতা অমিতা কুশারী। শৈশব কেটেছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মেহেরপুরে। ১৯৪২-৪৫ সময়ে তার বাবা মেহেরপুর মহকুমার মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল কেতকী কুশারী বোস।
প্রেসিডেন্সি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়েন তিনি। ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে রেকর্ড নম্বর পেয়ে বিএ পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৭৫ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রাক্কাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থানকারী ইংরেজ পুরুষ ও নারীর দিনলিপি এবং আত্মস্মৃতির বিশ্লেষণ।
অক্সফোর্ডেই পরিচয় হয় ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা, পদার্থবিদ্যার ছাত্র রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে, পরে বিবাহে পরিণতি লাভ করে। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের পর নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর পদবি ‘ডাইসন’ যুক্ত করেন কেতকী। তাদের প্রথম পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন ১৯৬৭ সালে এবং কনিষ্ঠ পুত্র ইগর নীলাদ্রি ডাইসন ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করে। রবার্ট ডাইসন ছিলেন কেতকীর সৃষ্টিশীল কাজের নিবেদিত সঙ্গী।
বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষার সাহিত্যচর্চাতেই সমান সাবলীল ছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসন। তার রচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বুদ্ধদেব বসুর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই দুই দিকপালের বহু লেখা তিনি দক্ষতার সঙ্গে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বল্কল’। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে প্রকাশিত হয়েছে মোট ছয়টি কাব্যগ্রন্থ।
ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা আত্মজীবনীমূলক ‘নারী, নগরী’ ১৯৬৫ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮১ সালে গ্রন্থাকারে বের হয়। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে তুলে ধরা এই নারীবাদী উপন্যাসের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “এই উপন্যাসে... সত্তরের দশকের নারী-আন্দোলনের ফসল ঘরে আনা হয়েছে।” এই উপন্যাস রচনার সময় তিনি ‘Towards a Multi-Dimensional Women's Movement’ শীর্ষক একটি ইংরেজি প্রবন্ধ লেখেন। তার অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘জল ফুঁড়ে আগুন’ (২০০৩) ও ‘এই পৃথিবীর তিন কাহিনী’ (২০০৬)।
গবেষণাকর্মেও তিনি ছিলেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ (১৯৮৫) পাঠকমহলে বিশেষ সাড়া ফেলেছিল। ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থটি তিনি সুশোভন অধিকারী ও রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন। তার প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে আরও রয়েছে ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ (১৯৮৮), ‘শিকড় বাকড়’ (১৯৯০), ‘চলন্ত নির্মাণ’ (২০০৫) এবং ‘কাছে-দূরের কক্ষপথে’ (২০১৫)।
বাংলা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বল্কল’ (১৯৭৭), ‘সজীব পৃথিবী’ (১৯৮০), ‘জলের করিডোর ধরে’ (১৯৮১), ‘কথা বলতে দাও’ (১৯৯২), ‘যাদুকর প্রেম’ (১৯৯৯) ও ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ (২০০০)। ইংরেজি সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘Sap Wood’ (১৯৭৮), ‘A Various Universe’ (১৯৭৮), ‘Hibiscus in the North’ (১৯৭৯), ‘Spaces I inhabit’ (১৯৮৩), ‘In Your Blossoming Flower-Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’ (১৯৮৮), ‘Bilingual Women’ (১৯৯৪), ‘Memories of Argentina and Other Poems’ (১৯৯৯) এবং ‘In That Sense You Touched It’ (২০০৫)। নাটক রচনাতেও তার স্বাক্ষর রয়েছে—‘রাতের রোদ’ (১৯৯৪), ‘মোত্সার্ট চকোলেট’ (১৯৯৮) ও ‘সুপর্ণরেখা’ (২০০২)।
অনুবাদকর্মেও তিনি রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এর মধ্যে রয়েছে ‘আংলোস্যক্সন কবিতা’ (১৯৮৭), ‘Kobirul Islam, Poems’ (১৯৭৯), ‘The Home-Coming by Kabirul Islam’ (১৯৮২), ‘I Won’t Let You Go: Selected Poems of Rabindranath Tagore’ (১৯৯১), ‘Night's Sunlight’ (২০০০), ‘The Selected Poems of Buddhadeva Bose’ (২০০৩) এবং মানবেন্দ্র নাথ রায়ের ইংরেজি রচনার বাংলা অনুবাদ ‘ভারতীয় নারীত্বের আদর্শ’ (১৯৮৮)।
সম্মাননার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ঋদ্ধ। ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত কাজি ফয়জল নাসের পদক সম্মাননা, ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালে আনন্দ পুরস্কার—যার প্রথমটি ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গ্রন্থের জন্য—এবং ১৯৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে স্টার আনন্দ পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি।
জীবনের শেষ পর্ব অবশ্য সহজ ছিল না। প্রায় এক দশক আগে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন তিনি; কিন্তু তাতেও থেমে যায়নি তার সৃষ্টিশীলতা। ২০২১ সালে করোনার প্রথম টিকা নেওয়ার অব্যবহিত পরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং এরপর থেকে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সেই দীর্ঘ অসুস্থতার সময়েও স্বামী রবার্ট ডাইসন ছিলেন তার পাশে, সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন তাকে।
বিদেশে থেকেও বাংলা ভাষা, বাংলা হরফ ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তার যোগ কখনও ছিন্ন হয়নি। কিংবদন্তি লেখক বুদ্ধদেব বসুকে তিনি কথা দিয়েছিলেন, বাংলায় তিনি লিখবেন—সেই কথা তিনি আজীবন রেখেছেন। তার চলে যাওয়ায় বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষার সাহিত্যজগতেই নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ভৌগোলিক দূরত্বকে কখনও মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্কের পথে বাধা হতে দেননি যে সৃষ্টিশীল মানুষটি, তার সাহিত্যভুবন ও সৃষ্টির সম্ভারেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন কেতকী কুশারী ডাইসন।







