প্রকাশ্যে দেখার দিন

কবির নিউ ইয়র্কের বাসায় কবি আলফ্রেড খোকনের প্রথম দেখার স্মৃতি
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে আমার স্বল্পকালীন আমেরিকান সেলফোনের রিঙার টোন বেজে উঠল। অন্যপ্রান্ত থেকে অপরিচিত এক কণ্ঠ, মনে হলো কেন জানি চেনা চেনা। বললেন, খোকন আমি শহীদ ভাই, শহীদ কাদরী বলছি। পত্রিকায় তোমার নিউ ইয়র্কে আসার খবরটি দেখে নীরাকে বললাম যেভাবে পারো ওর ফোন নাম্বার জোগাড় করো। নীরা তার বান্ধবী লিপিকে জানায়, লিপি তোমার নাম্বারটি পাঠিয়েছে। সেল্যুলার ফোনে কান রেখে মুহূর্তের এই কথা শুনে আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারিনি যে, এটা ঠিক কবি শহীদ কাদরীর ফোন! আমি বললাম— শহীদ ভাই, আপনি কি আসলেই শহীদ কাদরী? হ্যাঁ খোকন, আমি আসলেই তোমার শহীদ ভাই, তোমাকে নিউ ইয়র্কে অভিবাদন কবি। আমি বললাম, আপনাকে আমার প্রাণের আলিঙ্গন! শোনো, ঠিকানা পত্রিকায় তোমার ছবি দেখে কী যে ভালো লাগল, আমি তা বোঝাতে পারব না। আমি তাকে বললাম, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে কথা বলছি এবং এটাও বিশ্বাস হচ্ছে না যে স্বয়ং কবিই আমাকে ফোন করেছেন। তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সেই নীরবতার ভাষার কোনো অনুবাদ হয় না। আমেরিকার আইওয়া ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রজেক্টের নিমন্ত্রণ রিফিউজ করেছিলাম ২০০৮ সালে। কারণ যখন মোবাইল ফোনে এ নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, তখন আমি মধুর ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে তেল-গ্যাস কমিটির প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমেরিকার বিরুদ্ধে স্লোগান দেব— জান দেব তো গ্যাস দেব না, এমন মুহূর্তে এ আমন্ত্রণ। আমার সামনে আনু মুহম্মদ, জোনায়েদ সাকি, বন্ধু জাঈদ আজীজসহ আরও অনেক ছাত্র-শিক্ষক প্রতিবাদী। যাই হোক, পরে পারভীন ইলিয়াসের কাছ থেকে জেনেছিলাম যে, এ ধরনের দেশের নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করলে, ব্ল্যাক লিস্টেড করে দেওয়া হয় আর ভিসা দেয়া হয় না। তিনি আমার পরিস্থিতি ও বয়স বিবেচনা করে, একটি ফরোয়ার্ডিং লেটার লিখে রেখেছিলেন, আমি দেশের কাজে ব্যস্ত থাকায় এবার যেতে পারছি না, পরবর্তী সময়ে যাব। যদিও এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা ছিল না। পরে এক ঘরোয়া আড্ডায় পারভীন ইলিয়াসের কাছ থেকে এ কথা জেনেছিলাম। তিনি ইউজিসির পরিচালক ছিলেন। ২০১৪ সালে ভিসা পেলাম। প্রথমবারের মতো আমেরিকায় যাব। বেড়াতে নয়, কাজে। বিভিন্ন এস্টেটে কনসার্ট হবে, আমি তার একজন ডিরেক্টর। আমার কাজ মঞ্চের নেপথ্যে। লস অ্যাঞ্জেলেসে কনসার্ট শেষ করে নিউ ইয়র্কে আসলাম। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ নিউ ইয়র্কের অস্ট্ররিয়াতে প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন হলো। পরদিন কয়েকটি বাংলা পত্রিকায় ফ্রন্ট পেজে আমার ছবিসহ থ্রিসি কলাম বক্স করে নিউজ ছাপল। ছবি ছাপার কথা শিল্পীদের। কিন্তু ছেপে দিল আমার ছবি! সঙ্গে হেডলাইন করল— কবি আলফ্রেড খোকন এখন নিউ ইয়র্কে। পরে কনসার্টে দেখা হওয়া দুই সাংবাদিক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম— তারা উত্তর দিল, আপনি কবি এবং আমাদের মিডিয়ার সতীর্থ। ছবি তো আপনারই ছাপা হওয়া ন্যায্য। আমি আর কথা উৎপাদন করলাম না। কিন্তু লাভ হলো অন্য। কবি শহীদ কাদরী বললেন, গতকাল পত্রিকায় তোমার নিউ ইয়র্কে আসার খবরটি দেখে নীরাকে বললাম যেভাবে পারো ওর ফোন নাম্বার জোগাড় করো। নীরা তার বান্ধবী লিপিকে জানায়, লিপি তোমার নাম্বারটি পাঠিয়েছে। তো শোনো আমি এখন ডায়ালাইসিসে বের হবো। তুমি কবে কখন আসবে আমার জ্যামাইকার বাসায়? আমি তো হুইলচেয়ারে চলি, তারপর একজন নার্স আছে আমাকে হেল্প করছে। ও আবার অত কিছু বোঝে না। আমি স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে থাকলে তোমাকে নিজে গিয়ে নিয়ে আসতাম। আমি শহীদ ভাইকে বললাম, আমিও তো এখানে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, তাই একটু কথা বলে দেখি, কেউ ড্রাইভ করে নিয়ে যায় কি না। না হলে আমি একাই ট্যাক্সি নেব। তিনি বললেন, আমার বাসা জ্যামাইকা, তোমাকে হোল্ডিং অ্যাড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি। সন্ধ্যার দিকে ফোনে পাবে আবার। আমি বললাম, আপনি যান— আমাদের দেখা হচ্ছে, আপনার সঙ্গে দেখা না করে দেশে ফিরছি না। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, স্থানীয় সময় দুপুর ১টা। আমেরিকা প্রবাসী অনুজ বন্ধুপ্রতিম সৈয়দ জামান তার লাল হ্যামার গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে পৌঁছালেন জ্যামাইকার একটি বহুতল ভবনের সামনে। অভ্যর্থনা কক্ষে দাঁড়ানো আমার মতো কালো চামড়ার গার্ডকে বললাম, কবি শহীদ কাদরীর বাসায় যাব। জিজ্ঞেস করলেন আমার নাম। বললাম মাই নেই ইজ আলফ্রেড খোকন। মুচকি হেসে উত্তর দিলেন— ইউ আর এ বেঙ্গলি পোয়েট অলসো। প্লিজ গো টু দ্য সেকেন্ড ফ্লোর। তার মুচকি হাসির অর্থ কবি শহীদ কাদরী আগেই আমার আসার কথা তাকে বলে রেখেছিলেন। লিফট থেকে নেমে হাতের বামে একটু এগিয়ে দরজার কলিংবেল চাপতেই দীর্ঘাঙ্গী, সুঠাম দেহে শার্ট-প্যান্ট পরা মোটাসোটা ভিনদেশি এক তরুণী দরজা খুলে জানতে চাইলেন— হ্যালো, ইউ আর এ পোয়েট মি. খোকন, রাইট? বললাম, ইয়েস। সে বলল— প্লিজ, কাম ইন। ঘরে ঢুকে দক্ষিণে তাকাতেই দেখলাম মাথায় শরতের মেঘের মতো উড়ন্ত সাদা চুল, গোলগাল মুখ, দিগন্তের মতো চক্ষুযুগল— সেখানে কত দৃশ্যের গোঙানি! করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাতখান তুলতে চাইছেন, ব্যান্ডেজ করা সেই সন্ততির হাতখান! অভিবাদনের জন্য দাঁড়াতে চাইছেন কিন্তু দাঁড়াতে পারছেন না কবি! শহীদ কাদরী, বাংলা ভাষার তুমুল জনপ্রিয় কবি। শহীদ ভাই তার দরাজ গলায় ডাক দিলেন এদিকে আসো ভাই। আমি কাছে গিয়ে বসলাম তার কাছাকাছি। এটাই আমার প্রথম দেখা! এভাবে আমাদের কথাবার্তার শুরু। সে অনেক কথা, যেন বিরহী প্রেমিকের মতো। ৩৫ বছর ধরে বুকের মধ্যে জমতে থাকা কথামালার আজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। কথার এক ফাঁকে নার্সকে বললেন, ওই র্যাক থেকে কয়েকটি বই নামিয়ে দাও। তার নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটি বই এনে তার হাতে দিল। আমার সাধারণ কবিতা, টোকনের দূর সম্পর্কের মেঘ, কামরুজ্জামান কামুর কবি মুখপত্রহীন। বললেন, অনেক কষ্টে আনিয়েছি, তোমাদের আরেক বন্ধু ইদানীং নাটকে অভিনয় করে, কী যেন নাম? মারজুক রাসেল। হ্যাঁ, ওর বই নেই। বললাম— ওর বইয়ের নাম চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোল। মারজুককে বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছি। তোমাদের আরও বই, মারজুকের একটা বই এবং তোমাদের সমকালে আরও যে বন্ধুরা ভালো লিখছে এমন ৮-১০ জনের বই আমাকে পাঠিও। আমার একজন যাবে, ওকে তোমার ঠিকানা বলে দেব, যোগাযোগ করে নেবে। তারপর আমাদের দুজনের একান্ত আলাপ যেভাবে এগিয়েছিল— তার মধ্যে অগ্রজ ও অনুজের বিস্ময়ের ঘোরলাগা একটা দুপুর কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়, তা জানে নীরা কাদরী। আর জানে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নার্স, তার নামটি আমি ভুলে গেছি! শহীদ ভাই থাকলে ফোনে জেনে নিতে পারতাম। আজ ২৪ অাগস্ট, এই লেখা যখন লিখছিলাম, তখন রাত সাড়ে ১০টা। হঠাৎ মনে হলো, নীরা ভাবিকে একটা ফোন দিয়ে দেখি। ফোন করলাম, তিনি জানালেন শহীদ ভাইয়ের সব লেখাই কবি প্রকাশনীর সজল আহমেদ মুদ্রণ করে ফেলেছে এরই মধ্যে এবং তাকে যখন বললাম, সেই নার্স যে আমাকে দরজা খুলে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তার নামটি আপনার মনে আছে? তিনি সহাস্যে বললেন, হ্যাঁ, মনে থাকবে না! ওর নাম— মনিকা হোয়াট। একপর্যায়ে শহীদ ভাই বললেন— সকাল সাড়ে ৯টায় উঠে বসে আছি, তুমি আসবে বলে। কিন্তু নীরা ভাবি ফোনে বললেন, আপনি নাকি ১১টার আগে ওঠেন না, তাইতো আমিও দেরি করেছি, যদিও পথে আজ কিছুটা ট্রাফিক জ্যাম ছিল, তা ছাড়া জামান তার গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরেছে আশপাশে! শহীদ কাদরী জানালেন, নীরা ঠিকই বলেছে কিন্তু সেটা প্রাত্যহিক। আজকের ঘটনা তো সাধারণ না, আজকের অপেক্ষা তো আলাদা, ওরা তা বুঝবে না। বলো, কেমন ছিলে? কবে এসেছে আমেরিকা? এসেছি ২০ দিন হলো, যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, তিন দিন বাদেই চলে যাব। বলো কী! আমি তো হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে-ফিরতে পারি না, সপ্তাহে তিন দিন যায় ডায়ালাইসিসের ওপর। না হয় তোমাকে কবেই নিজে গিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম। নীরাকে বলেছি, ছেলেটি কবে আসছে, কোথায় থাকছে, কে জানে! হ্যাঁ, নীরা ভাবি আপনার হাহাকারের কথা একটু আগেই জানালেন। সঙ্গে বই এনেছ? তোমার বই দরকার। তারপর তোমার দশকের কবিদের বই দরকার। আমি একটি কাজ করার চেষ্টা করছি। যদিও আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দুই বাংলার মোটামুটি একই, তবুও আমার এই বিশ্বাস জন্মেছে যে, দুটো আলাদা রাষ্ট্র হওয়ায় এবং দুটো আলাদা রাষ্ট্রের ইতিহাস আলাদা হওয়ার কারণে আমাদের গল্প, উপন্যাস এবং কবিতা সবই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ফলে আমাদের বৈশিষ্ট্যকে শনাক্ত করা দরকার। আমি চেষ্টা করছি ‘বাংলাদেশের আধুনিক কবিতা’— এই নামে একটা সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করার। নিউ ইয়র্কে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে, এমন করে কেউ ফোন করে কাছে ডাকেনি। এক তরুণের কাছে তার এই ডাক ছিল, যেন রক্তের সম্পর্কের আপন ভাইয়ের ছোট ভাই যাবে এমনই স্বাভাবিক। সেখানে আমাদের কারও কোনো রাখঢাক নেই, এ যেন প্রতিদিনকার মতো সহজ-সরল। অথচ এমন একজন মানুষ যার সঙ্গে এর আগে আমার কখনো দেখা হয়নি— এই তো কবি শহীদ কাদরী। প্রথমে স্বেচ্ছা নির্বাসন, তারপর দেশে ফেরার তীব্র আকুলতা থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে দেশে ফিরতে না পারার একবুক বেদনা নিয়ে ৩৫ বছর প্রবাসজীবন পাড়ি দিয়েছেন তিনি! আশির দশকে বন্ধুদের প্রতি অভিমান করে (তার ভাষায়) দেশ ছেড়ে ছিলেন তিনি। শহীদ ভাইয়ের প্রিয়তম ইচ্ছেদের মধ্যে একটি— দেশে ফেরা। অন্যটি ‘বাংলাদেশের আধুনিক কবিতা’র সম্পাদনা গ্রন্থ প্রকাশ করা। দেশে তিনি ফিরেছিলেন শবদেহ হয়ে। আর বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার সম্পাদনা গ্রন্থ আঁতুড়ঘরে রেখে চলে গেলেন। আপনার এমন দিন আনার প্ল্যানটা থেকে গেল, হয়তো থেকে যাবে আমাদেরও। হঠাৎ কোনো এক নিরাভরণ সন্ধ্যার আবছা আঁধারে, হৃদয়ের বার-এ বসে আপনাকে মনে পড়বে, চোখ ভিজবে আর ঠোঁট বিড়বিড় করে পান করবে— ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি— পাবে না, পাবে না, পাবে না’।








