মহানগর নাট্যমঞ্চের প্রাণ ফিরবে?
- বদলে যাচ্ছে মহানগর নাট্যমঞ্চ
- থাকবে মিলনায়তন, সিনেপ্লেক্স, ব্যাংকুইট হল
- ভাড়া কম রাখার দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের
- ‘আরেকটি ফেইলর প্রজেক্ট যেন না হয়’

তিন দশক পর নবরূপে ফিরছে গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চ। তৈরি হচ্ছে নতুন ভবন, যেখানে থাকবে অত্যাধুনিক মিলনায়তন, সিনেপ্লেক্স, ব্যাংকুইট হলসহ নানা সুবিধা। তবুও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির পুনর্জাগরণ হবে তো? এটি ব্যবহারে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আরেকটি ‘ফেইলর প্রজেক্ট’ হওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
ঢাকার গুলিস্তান নামটির সঙ্গে পরিচিত নন, এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। গুলিস্তান সিনেমা হলের নাম থেকেই এ জায়গার নামকরণ হয় গুলিস্তান। কালের আবর্তে সেই সিনেমা হলটি হারিয়ে গেছে, টিকে আছে নামটি। গুলিস্তানসহ পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিবেচনায় নব্বইয়ের দশকে এখানে তৈরি করা হয় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যা মহানগর নাট্যমঞ্চ নামে পরিচিতি পায়। যদিও এর আনুষ্ঠানিক নাম কাজী বশির মিলনায়তন। পরে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় মহানগর নাট্যমঞ্চটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে তার পরিচয় ধরে রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে কয়েক বছর সচল থাকলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে একসময় অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এতে ভ্রাম্যমাণ মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয় জায়গাটি।
সেই মহানগর নাট্যমঞ্চকে নবরূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), যার কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা রাজীব খাদেম আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রথমে প্রকল্পটি সংস্কারকাজ হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরু করার পর ভবনের ভেতরের প্রকৃত অবস্থা দেখে পুরো পরিকল্পনাই বদলে যায়। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় চেয়ার, কাঠের কাঠামো, পর্দা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে শুধু সংস্কার নয়, পুরো স্থাপনাকেই নতুনভাবে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নাট্যমঞ্চ নয়, বহুমুখী সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হিসেবে মহানগর নাট্যমঞ্চকে গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে থাকবে মিলনায়তন, সিনেপ্লেক্স, ব্যাংকুইট হলসহ নানা সুবিধা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সংস্কৃতিকর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন, দুর্বল আলো ও শব্দ প্রক্ষেপণ ব্যবস্থার কারণে মিলনায়তনটিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা সম্ভব হচ্ছে না। নবনির্মিত ভবনে সেই সমস্যা থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরনো অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে থাকবে প্রদর্শনী স্পেস, প্রশস্ত লবি, আধুনিক শব্দ ও আলোক প্রক্ষেপণ এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
এমন আধুনিক রূপান্তরের পরও মহানগর নাট্যমঞ্চে সংস্কৃতিচর্চায় প্রাণ ফিরবে কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দিহান সংস্কৃতিকর্মীরা। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নতুন এ পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্তত দশজন সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তাদের মধ্যে অগ্রজ নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠকও রয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু একটি ভবনের অবকাঠামো তৈরি করলেই হয় না। সেটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী কি না এবং কীভাবে তা ব্যবহার হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মানস ঘোষ বাবুরাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘মহানগর নাট্যমঞ্চ নতুন করে চালু হলে অবশ্যই ভাড়া কম রাখতে হবে। নইলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো উৎসাহ হারাবে। এ দাবি আমরা প্রশাসনকে জানাব।’ পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, ‘এটি সিটি করপোরেশন থেকেই তৈরি করা হয়েছে। পরে লাইট-সাউন্ড, এসি ঠিকমতো কাজ করে না। এগুলো বাইরে থেকে আনতে হয়। ভাড়াও দিতে হয় প্রতি শিফটে ১০ হাজার টাকার বেশি। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠান করতে অনেক টাকা খরচ হয়। সম্প্রতি ঢাকা নাট্যোৎসবের মধ্য দিয়ে জহির রায়হান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আবার নবোদ্যমে চালু হয়েছে। আমরা ডিএসসিসি প্রশাসককে অনুরোধ করেছি ভাড়া কমানোর জন্য। তিনিও ব্যাপারটি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। মহানগর নাট্যমঞ্চেও ভাড়া কম রাখতে হবে।’
ডিএসসিসি সূত্র বলছে, মহানগর নাট্যমঞ্চের মূল ভবনের নির্মাণকাজে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪ কোটি টাকা। এর বাইরে পার্কের সৌন্দর্যবর্ধন, গার্ডেনিং, ফোয়ারা, উন্মুক্ত চত্বর এবং পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা তৈরির জন্য আলাদা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মূল ভবনের কাজ শেষ হলেও পুরো প্রকল্প শেষ করতে আরও সাত থেকে আট মাস সময় লাগতে পারে। এরপর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি ব্যবহারের একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।
অভিনয়শিল্পী, নাট্যনির্দেশক ও সংগঠক আজাদ আবুল কালাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘মহানগর নাট্যমঞ্চ যখন প্রথম তৈরি হয়েছিল, তখন থেকেই এটি নাটক মঞ্চায়নের অনুপযোগী ছিল। এটি এখন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীদের এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার ছিল। একটি ভবন বানিয়ে দিলাম, তাহলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেই ভবনটি কীভাবে ব্যবহার হবে, সেখানে কী কী সুবিধা থাকা উচিত, তা ভাবাটাও জরুরি। সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ততা ছাড়া তো সাংস্কৃতিক কেন্দ্র টিকবে না। তার রক্ষণাবেক্ষণটাও জরুরি। নইলে এটাও ফেইলর প্রজেক্ট হবে।’
মহানগর নাট্যমঞ্চ নির্মিত হয় ১৯৯৭ সালের দিকে, তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ হানিফের উদ্যোগে। পরে এর নামকরণ করা হয় ‘কাজী বশির মিলনায়তন’। উদ্দেশ্য ছিল পুরান ঢাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ নাট্যকেন্দ্র তৈরি করা, যাতে শিল্পকলা একাডেমি ও মহিলা সমিতির বাইরে নতুন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে ওঠে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণকাজের মাঝেও সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। গাছঘেরা ও নীরব স্থানে দিনের বেলাতেই কিশোর মাদকসেবীদের দেখা যায়। আবার নাট্যমঞ্চের পেছনে প্রকাশ্যে গাঁজাসেবীদেরও দেখা যায়। প্রবেশমুখ জুড়ে খাবারের দোকান, ভেতরে শিশুদের খেলাধুলার স্থান, পুকুরপাড়ে আড্ডা, মনোহারী ও খেলনার স্টল— সব মিলিয়ে এলাকাটি নগর পার্ক হিসেবেও পরিচিত। বঙ্গভবন, মাওলানা ভাসানী জাতীয় স্টেডিয়াম আর মহানগর নাট্যমঞ্চ যেন এক ত্রিভুজের তিনটি বিন্দু। নতুন ও পুরান ঢাকার সন্ধিস্থলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনতিদূরে এর অবস্থান। ফলে নগর ঢাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে এটি ওই এলাকার মানুষের মাঝে সাড়া ফেলবে বলেই আশা অনেকের। তবে এটি যেন প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে নষ্ট না হয়— এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।



