রামমোহন রায়ের নামাঙ্কিত
ঢাকার প্রথম পাঠাগারটি কি হারিয়ে যাবে?
- ১৯৪৭ সালেও ছিল ৩০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ, এখন হাজারেরও কম
- পাঠক প্রায় যায়-ই না, নেই রক্ষার উদ্যোগ

জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবন। পলেস্তারা খসে পড়া সেই ভবনের ইটের ফাঁক দিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটগাছ। যেন পরিত্যক্ত ভবনেও জীবনের হাতছানি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির সামনের দিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি দোকান। পাশের ব্যস্ততম সড়কে মানুষের ভিড়। ঝুঁকি জেনেও থেমে নেই জীবিকার সংগ্রাম। যে ভবনটির কথা বলা হচ্ছে, এটি ঢাকার প্রথম পাঠাগার। কেউ কেউ অবশ্য নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিকে প্রথম পাঠাগার মনে করেন। তবে ইতিহাস বলছে, নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রামমোহন রায় লাইব্রেরি। পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে কলেজিয়েট স্কুলের কাছে বাংলাদেশ ব্রাহ্মসমাজ কার্যালয়। আর এখানেই অবস্থিত রামমোহন রায় লাইব্রেরি।
সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়কে বলা হয় ভারতের নবজাগরণের পথিকৃৎ। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ছিল তার প্রয়াণ দিবস। এদিন ঘুরতে গিয়ে দেখা হলো রামমোহন রায়ের নামাঙ্কিত পাঠাগারটির সঙ্গেও। সরেজমিনে দেখা যায়, কালের বিবর্তনে শতবর্ষী এ পাঠাগারটি এখন বিলীন হওয়ার পথে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার থেকে পাঠাগারটি রক্ষায় নেই কোনো পৃষ্ঠপোষকতা। বাংলাদেশ ব্রাহ্মসমাজের সাধারণ সম্পাদক রনবীর পাল রবি আগামীর সময়কে জানালেন, তারা যেকোনোভাবে পাঠাগারটি চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তবে খুব বেশি পাঠকও আসেন না। নেই অবকাঠামোগত সুবিধাও। মাত্র কয়েকশ বই নিয়ে ভেতরে মন্দির ভবনে টিকে আছে পাঠাগারটি। অথচ ১৯৪৭ সালেও এ পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের বেশি। পাঠাগারের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। নেই সংস্কারের কোনো উদ্যোগ।
পাশেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুলসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অবস্থানগত দিক থেকে পাঠাগারটি শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞানের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে ওঠেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আব্দুল্লাহ বললেন, ‘এ পাঠাগারের কথা তো জানতামই না।’ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফ্রিদিতা বলেছেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে পুরান ঢাকা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা ছিল না। এখানে ঘুরে অবাক হয়েছি। আমার তো মনে হয়, পুরো পুরান ঢাকাকে ঐতিহ্য ঘোষণা করে সংরক্ষণ করা উচিত।’
১৯৫১ সালে প্রকাশিত বঙ্গবিহারী করের লেখা পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত বই থেকে জানা যায়, পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে রামমোহন রায়ের নামে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অভয় চন্দ্র দাশ, ১৮৬৯ সালে। পৃথক পাঠাগার ভবনের যাত্রা শুরু হয় ১৯১০ সালে। এই ভবনের গায়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার সাল লেখা রয়েছে ১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি। জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পাঠাগারটির নিয়মিত পাঠক ছিলেন। ১৯২৬ সালে পাঠাগারটি দেখতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তার জীবনের মধুর একটি উপলক্ষে এখানে এসেছিলেন ১৯২৪ সালে। লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে এই ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরেই বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। এই পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দেবীও।
রামমোহন রায় পাঠাগারের জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবনটি যেকোনো সময় রাস্তার ওপর ধসে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় রাজউক ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল সাত দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। এরপরের বছরই ব্রাহ্মসমাজের আচার্য ও ট্রাস্টি প্রাণেশ সমাদ্দার উচ্চ আদালতে রিট করে ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন করেন। পরে ঢাকা সিটি করপোরেশন এক চিঠিতে জানিয়েছে, রাজউকের করা ঢাকার ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনার তালিকার ৯৩টি স্থাপনার মধ্যে এ পাঠাগারটিও রয়েছে। তাই রাজউকের নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ছাড়া তালিকাভুক্ত স্থাপনার আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ অপসারণ, পুনর্নির্মাণ ও পরিবর্ধন করা যাবে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রনবীর পাল কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে ভবনের বিষয়টি এখনো মীমাংসিত নয় বলে ব্রাহ্মসমাজ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যে কারণে পুরনো ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল— এ ১০ বছর পাঠাগারটি বন্ধ রাখতে হয়। ২০১৬ সাল থেকে পাঠাগার ভবন থেকে বইপত্র এনে মন্দির ভবনের দোতলায় কার্যক্রম চালু রাখা হয়। বর্তমানে সেখানেই চলছে পাঠাগারের কার্যক্রম।
বেলা ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত প্রতিদিন খোলা রাখা হয় পাঠাগারটি। তবে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। রনবীর পাল জানিয়েছেন, কেউ এসে যোগাযোগ করলে তারা পাঠাগার খুলে দেন। তবে পাঠক খুব বেশি আসেন না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প করা হয়েছিল পাঠাগারটিতে। এ সময় লুট হয়ে যায় শতবছরের বেশি সময় ধরে সংগৃহীত মূল্যবান নথিপত্র, অসংখ্য সাময়িকী ও দুষ্প্রাপ্য নানা বইপত্র। পাঠাগারটির দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায় লুটপাটকারীরা। স্বাধীনতার পর পাঠাগারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। লুট হওয়া বইপত্র উচ্চমূল্যে কিনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রবাসী পত্রিকার দুটি কপি ছাড়া আর কিছুই ফেরত পাওয়া যায়নি।
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা রামমোহন রায় লাইব্রেরির মূল ভবন আজ জরাজীর্ণ। একসময় যেখানে ছিল ৩০ হাজারের বেশি বইয়ের সংগ্রহ, সেখানে এখন হাজারেরও কম বই নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে পাঠাগারটি। পাশে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ জানেন না এ পাঠাগারের ইতিহাস। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— ঢাকার প্রথম পাঠাগারের ঐতিহ্য কি এভাবেই হারিয়ে যাবে?




