প্রবাসের শূন্যতা

নিউ ইয়র্কে কবির ৬৫তম জন্মদিনে সস্ত্রীক শহীদ কাদরীর পাশে শাহীন খান
‘বুঝলা শাহীন, ক্রিয়েটিভ মানুষের জন্যে প্রবাসী হওয়া একটা খতরনাক জিনিস।’ নিউ ইয়র্ক শহরে জ্যামাইকার পারসন্স বুলেভার্ডে নীরা আপা আর শহীদ ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টের লিভিং রুমের সোফায় বসে আমাকে বলেছিলেন কবি শহীদ কাদরী। মাসে এক-দুবার যাওয়া হতো ওদের অ্যাপার্টমেন্টে শহীদ ভাইয়ের সঙ্গ নিতে। মাঝেমধ্যে নীরা আপাও ডেকে পাঠাতেন— শহীদ ভাইকে উজ্জীবিত করার জন্য। কোনো কোনো দিন খুব মুডে থাকতেন। প্রচুর গল্প করতেন, পুরনো দিনের কথা বলতেন, আড্ডা জমিয়ে তুলতেন। কোনো কোনো দিন গিয়ে দেখতাম বেশ ক্লান্ত, একটু বিমর্ষ। কিডনি ডায়ালাইসিসের ধকল সামলাতে কখনো বেশি সময় লেগে যেত। সেই সন্ধ্যায় একটু বিমর্ষই ছিলেন সম্ভবত। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম শহীদ ভাই আমাকে নিয়ে বললেন কথাটা। মাঝেমধ্যেই আমার দেশ ছেড়ে নিউ ইয়র্কে থাকা নিয়ে কথা বলতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘কী করো এখানে? দেশে ফিরে যাও।’ পরে বুঝেছি, কথাটি আসলে আমাকে যতটা না উদ্দেশ্য করে বলা, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল নিজের জীবনকে ফিরে দেখা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উচ্চারিত এক গভীর উপলব্ধি। সত্তরের দশকের সামরিক শাসনকে ‘চৌকিদারের শাসন’ বলে দেশ ছেড়ে যাওয়া শহীদ কাদরী শেষের দিকে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন দেশে ফেরার জন্য। শহীদ কাদরীকে যারা যৌবনে দেখেছেন তাদের কারও কারও বর্ণনায় শুনেছি যে, তিনি ছিলেন দুর্বিনীত। আড্ডায় কাউকে কথার আঘাতে ঘায়েল করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন, সেই দৃশ্য উপভোগ করতেন। স্বভাবে বোহেমিয়ান। খানিকটা উদ্ধতও কি ছিলেন? প্রচণ্ড আড্ডাবাজ শহীদ কাদরী ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে জায়গা করে নেন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়। খুব অল্প বয়সেই এ দেশের প্রধান কবিদের কাতারে উঠে আসেন তার নিজস্ব কাব্য ভাষার জন্য। হয়ে ওঠেন বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম শক্তিশালী, স্বতন্ত্র ও নাগরিক কণ্ঠস্বর। যৌবনেই কাদরী হয়ে ওঠেন ঢাকার প্রধান কবিদের আড্ডার মধ্যমণি। ঢাকার শিল্পসাহিত্যের অঙ্গনে চলাফেরা আছে এমন নারীদের মধ্যে সবচেয়ে রূপসী নারীদের একজনকে পেয়ে যান প্রেমিকা হিসেবে (পরবর্তীকালে স্ত্রী)। এমন কাদরী তো একটু উদ্ধত হতেই পারেন। ১৯৭৮ সালে দেশ ছেড়ে জার্মানি, যুক্তরাজ্য হয়ে প্রথম প্রেম ও স্ত্রী নাজমুন্নেসা পিয়ারীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবি পৌঁছে যান যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে। মাঝে অল্প কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন ১৯৮২ সালে। বোস্টনে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দাম্পত্যের অবসান হলে কবি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। ২০০৪ সালে নীরা কাদরীর সঙ্গে প্রেম ও পরিণয় শহীদ কাদরীকে এক নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। অসুস্থ কবিকে নীরা আপা প্রেম ও যত্নে সারিয়ে তুলতে নিজের সর্বস্ব নিয়োগ করেন। শহীদ ভাইও তাদের এই প্রেম নিয়ে গর্ববোধ করতেন। নিউ ইয়র্কে তার ৬৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কবি তাদের পারস্পরিক প্রেম নিয়ে গর্বের কথা খুব জোর দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন উপস্থিত সবার সামনে। কিন্তু নিউ ইয়র্কে এসে দীর্ঘদিনের নিভৃতচারী কবি এক ভয়ানক কোলাহলের মধ্যেও পড়েন। শহীদ কাদরীর মৃত্যুর পর স্বামীর প্রচারবিমুখতার কথা উল্লেখ করে নীরা কাদরী বলেছিলেন, ‘উনি বলতেন, পাঁচজন মানুষও যদি আমার কবিতা পড়ে মনে রাখে, এতটুকু আমার জন্য যথেষ্ট।’ এহেন প্রচারবিমুখ কাদরী নিউ ইয়র্কের মতো বাঙালি অধ্যুষিত শহরে এসে হাঁপিয়েও উঠেছিলেন বোধকরি। প্রবাসে বাঙালিদের মাঝে বড় মানুষদের নিয়ে টানাটানিটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে থাকে। সেটা শহীদ ভাইকে নিয়েও হতে লাগল। ছোট-বড় নানা অনুষ্ঠানে তাকে হাজির হতে হতো শারীরিক বৈকল্য নিয়েও। বলাই বাহুল্য, এসব অনুষ্ঠানের বেশিরভাগই হতো মানহীন, বিরক্তিকর। দিনের পর দিন শহীদ ভাইকে এসব অনুষ্ঠানে দীর্ঘসময় মঞ্চে বসে থাকতে হতো, বক্তৃতা দিতে হতো, মানুষের সঙ্গে ছবি তোলার আবদার মেটাতে হতো। এ অত্যাচার কখনো কখনো তার ঘর পর্যন্তও পৌঁছে যেত। প্রিয় সঙ্গ, প্রিয় বিষয় নিয়ে আড্ডা তাকে কেমন উজ্জীবিত করত আমি সেটাও প্রত্যক্ষ করেছি। একবার ডক্টর বিনায়ক সেন আমাকে অনুরোধ করলেন আমি যেন তাকে শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিই। এক সন্ধ্যায় বিনায়কদা আর আমি হাজির হলাম শহীদ ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে। দুজনের সেই সন্ধ্যার আড্ডা হয়ে উঠেছিল অপার্থিব। বিনায়ক সেন যে শহীদ কাদরীর কবিতার কত একনিষ্ঠ পাঠক সেদিন জেনেছিলাম সেটা। কবিতা, সংগীত, রাজনীতি, দর্শন, ঢাকা শহর সব মিলে এক প্রাণবন্ত আড্ডার সাক্ষী হয়েছিলাম সে সন্ধ্যায়। এরপরও বিনায়কদা ফিরে গেছেন শহীদ ভাইয়ের কাছে এবং তাদের কথোপকথন নিয়ে প্রায় ষাটোর্ধ্ব পৃষ্ঠার সাক্ষাৎকার তৈরি করেছেন, যা স্থান পেয়েছে ‘শহীদ কাদরীর সাক্ষাৎকার সমগ্র’ গ্রন্থে। শহীদ কাদরী আসলে মানুষের ভিড় নয়, সার্থক সঙ্গ চাইতেন। এর বাইরে কমিউনিটিতে তাকে নিয়ে আর যা যা হতো, তা তাকে ভালো থাকার রসদ জোগাতে পারেনি মোটেও। বরং ক্লান্ত করেছে তাকে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুরু করেছিলাম তার প্রবাসজীবন নিয়ে আক্ষেপের কথা দিয়ে। কেন প্রবাসী হয়েছিলেন তা নিয়ে অভিমান, বন্ধুদের বদলে যাওয়া— এমন নানা কথা চালু আছে। তার নিজের ভাষায়— ‘দেশ কেন ছেড়ে এসেছিলাম তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর আমার কাছে নেই। তবে অনেকগুলো জটপাকানো কারণ রয়েছে।’ দেশ ছেড়ে থাকার বেদনা শেষ জীবনে যে প্রকট হয়ে উঠেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই শূন্যতা কবি শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়িয়েছেন। তাইতো সবসময়ই দেশে ফিরতে চাইতেন। ‘শরীরটা একটু ভালো হলেই দেশে যাব’ বলতেন সবসময়। আমাকে ফিরতে উৎসাহ দিতেন। জরাক্লিষ্ট শরীর ও মন নিয়ে প্রবাসে বসে কবি তার শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’-এ স্বদেশকে মনে করে লেখেন— “স্বনির্বাচিত এই নির্বাসনে/ নেকড়ের দঙ্গলের মতো আমাকে ছিঁড়ে খাক বরফে জ্বলতে থাকা ঋতু/ শুধু তুমি,/ আমার সংরক্ত চুম্বনের অন্তর্লীন আগুনগুলোকে/ পৌঁছে দাও শ্রাবণে আষাঢ়ে রোরুদ্যমান/ বিব্রত বাংলায়,/ বজ্রে, বজ্রে, বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার।” শহীদ কাদরী স্বদেশে ফিরেছিলেন। ২০১৬ সালের আগস্টের শেষ দিনে নিউ ইয়র্ক থেকে বিমানে করে এসেছিল একটি কফিন। আর সেই কফিনের ভেতর শুয়ে ছিলেন এক কবি— যিনি একদিন বলেছিলেন, ‘ক্রিয়েটিভ মানুষের জন্যে প্রবাসী হওয়া একটা খতরনাক জিনিস।’







