উইলিয়াম ফকনার গুরুত্ব ও দূরত্ব

উইলিয়াম কাথবার্ট ফকনারের জন্ম ২৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৭ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে। লেখক-নামে ‘কাথবার্ট’ বাদ পড়ে। বিয়ে ১৯২৯ সালে, স্ত্রী স্ট্যাল ওল্ডহ্যাম। তাদের একটি মাত্র সন্তান। ফকনার বেঁচেছিলেন চৌষট্টি বছর। ১৯৬২ সালের ৬ জুলাই প্রয়াত হন, মিসিসিপিতেই। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৪৯ সালে, ৫২ বছর বয়সে। এসব তথ্য সহজেই যে কেউ জানতে পারেন, কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে বা সাহিত্যে ফকনারের ভূমিকা বা গুরুত্ব কী? এর একটি উত্তর আছে ত্রিশ বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে কথাসাহিত্যে লাতিন আমেরিকার দাপটের ভেতরে। যে কজন লেখক লাতিন আমেরিকার ‘বুম’ ঘটাতে দারুণভাবে প্রাণিত করেছিল, ফকনার তাদের অন্যতম। যেমন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস হেমিংওয়েকে তার মায়েন্ত্রো মনে করতেন, কিন্তু তার লিখনশৈলীতে হেমিংওয়ের চেয়ে ফকনারের প্রভাবই যেন বেশি পড়েছে। কেবল তার ‘কর্নেলকে কেউ লেখে না’ উপন্যাসটি হেমিংওয়ের ধারার বলে মনে হয়। মারিও ভার্গাস ইয়োসা বহু জায়গায় স্বীকার করেছেন, ফকনারের লেখা তিনি দাগিয়ে দাগিয়ে ও নোট করে করে পড়েছেন। ফরাসি ক্লদ সিমো, পর্তুগিজ অ্যান্তোনিও লবো অ্যান্তুস, উরুগুয়ের হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি ও মেক্সিকোর কার্লোস ফুয়েন্তেসদের মতো লেখকরাও কমবেশি ফকনারীয়।
অনেক দূরত্বে এসে উইলিয়াম ফকনারের লেখা সম্পর্কে আমাদের মনে হয়— তার পটভূমি তলস্তয়ীয়, কিন্তু লেখার ভেতরে নির্মমভাবে তুলে ধরা মনোজগৎটি দস্তয়েভস্কীয়। কেউ কেউ মনে করেন, ফকনার নিজের বংশের ইতিহাসকে সাহিত্যের মালমশলা হিসেবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তলস্তয়কেও ছাড়িয়ে গেছেন; যেটা পরে অনুসরণ করেছেন গার্সিয়া মার্কেস।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি পরিবারের সন্তান ছিলেন ফকনার। সে অঞ্চলেরই গল্পকাহিনি নিয়েই তৈরি হয়েছিল তার জগৎ। সবারই কমবেশি জানা আছে, ফকনারের সেই জগতের নাম দিয়েছিলেন য়ুকনাপটায়ুফা। য়ুকনাপটায়ুফা নামের কল্পিত সেই এলাকা আসলে বাস্তবতার চেয়ে বাস্তব; তেমন এক জগতের ভেতরে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গহিন-গহনের জটিল জীবন-দ্বন্দ্বের জালচক্রগুলো তিনি হাজির করেছেন। পরবর্তীকালে ভারতীয় ইংরেজি ভাষার লেখক আর কে নারায়ণের মালগুড়ি, কলাম্বীয় গার্সিয়া মার্কেসের মাকন্দো বা বাংলাদেশের সৈয়দ শামসুল হকের জলেশ্বরীর মতো কল্পিত এলাকার কাহিনিতে ফকনারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব আছে বলেই মনে হয়। ফলে তার গুরুত্ব অনুমেয়।
বাংলা ভাষায় ফকনারচর্চার দিকটায় একটু নজর দেওয়া যাক। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৩৪ সালে ‘উইলিয়ম্ ফকনার’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তৎকালের বেশ কিছু গণ্যমান্য লেখক সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন; পরিবর্তে তার কাছে হারমেন ব্রচ, উইলিয়াম ফকনার, জন ডস পাসোজদের মতো লেখকরা হয়ে ওঠেন আগামী উপন্যাসের পথিকৃৎ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সতীনাথ ভাদুড়ীকে ‘পূর্ণিয়া জেলার ফকনার’ মনে করতেন। এ নামে তার একটি প্রবন্ধও আছে।
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের অনুবাদে ‘হেমিংওয়ে ফ্রস্ট ফকনার’ নামে তিন সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের জীবন ও সাহিত্য-প্রবণতার রূপরেখা নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৬৯ সালে অর্থাৎ ১৯৬২ সালের দিকে। এতে অনূদিত হয়েছে উইলিয়াম ভ্যান ও’কোনরের ‘উইলিয়াম ফকনার’ রচনটি, যা থেকে ফকনারের সাহিত্যরচনার পটভূমি ও মূল সাহিত্যপ্রবণতাগুলো মোটামুটিভাবে বুঝে নেওয়া যায়।
১৯৬৯ সালে এম. আহমদ নামে একজন ‘দ্য বিয়ার’ নামের গল্পটি ‘ভালুক’ নামে বই বের করেছিলেন। সম্ভবত একই সালে শহীদ কাদরী ও মদন শাহুর যৌথ অনুবাদে ফকনারের ‘দ্য ওয়াইল্ড পামস’ থেকে ‘ওল্ড ম্যান’ অংশটি ‘আবর্ত’ নামে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। দুটি বই-ই ঢাকার খোশরোজ কিতাব মহল থেকে প্রকাশিত। প্রকাশক ছিলেন মহীউদ্দীন আহমদ (এম. আহমদও কি তিনিই?)। কাদরী-শাহুর অনুবাদটি ঢাকার ‘কবি’ প্রকাশনী থেকে আবারও প্রকাশিত হয়েছে। তার ‘স্যাংচ্যুয়ারি’ উপন্যাসের একটি অনুবাদ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। মনে পড়ে, বাংলাদেশে বিলুপ্ত সাহিত্যপত্রিকা ‘শৈলী’ ১৯৯৭ সালে, তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটি সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। তাতে নামমাত্র দু-তিনটি লেখা ছিল। এর ভেতরে একটি ছিল সুধীন দত্তের লেখাটির পুনর্মুদ্রণ।
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে কলকাতার ‘এবং মুশায়েরা’ থেকে দুটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়, একটি তার ‘অ্যাজ আই লে ডায়িং’-এর অনুবাদ ‘যখন আমি মৃত্যুশয্যায়’, অনুবাদ করেছেন স্বপন চট্টোপাধ্যায়; আরেকটি মনোজ চাকলাদার সম্পাদিত ‘নির্বাচিত গল্প: উইলিয়াম ফকনার’। ২০১৮ সালে ঢাকার ‘সন্দেশ’ থেকে আফসানা বেগমের অনুবাদে ‘মৃত্যুর প্রতীক্ষায় আমি’ নামে প্রকাশিত হয় ‘অ্যাজ আই লে ডায়িং’-এর নতুন অনুবাদ। অতিসম্প্রতি, জানুয়ারি ২০২৬ সালে, কলকাতার ‘বিদুর’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফকনারের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি’র অনুবাদ। অনুবাদকের নাম ঋত্বিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পত্রপত্রিকায় বোর্হেসের নানান লেখার অনুবাদ করে আসছিলেন, পরবর্তীকালে তিন খণ্ডে সেগুলো বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে এই হলো বাংলা ভাষায় ফকনারের বইপত্র কমবেশি যে কটা পাওয়া যায়। বাংলায় ফকনারচর্চা অপেক্ষাকৃত কম। বাঙালি পাঠকদের সঙ্গে তার যেন একধরনের দূরত্ব আছে। অন্তত হেমিংওয়ের চেয়ে, এমনকি জন স্টেইনবেকের চেয়েও বাংলায় ফকনারের চর্চা কম। এর দুটি কারণ আছে বলে বোধ করি। প্রথমটি হলো— ফকনার অনেক বেশি ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয়’ এবং দ্বিতীয়টি হলো— তার রচনাশৈলীর জটিলতা; বাঙালি অাসল-পাঠকের তাকে পড়া আয়াসসাধ্য বলেই মনে করে। কিন্তু তিনি তো জয়েসের মতো দুর্বোধ্য নন, বরং তার ইংরেজি-গদ্য দারুণ এক চিরায়ত বা ধ্রুপদি মেজাজেই যেন অভিষিক্ত হয়েছে।
জোসেফ বল্টনার ও কার্ল রলিসন দুজনই উইলিয়াম ফকনারের দুখণ্ডে জীবনী লিখেছেন। আকারে প্রকারে দুজনের দুটি খণ্ডই বিশাল। বল্টনারের লেখা জীবনীটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত। কার্ল রলিসন প্রথম খণ্ডের (প্রকাশ ২০২০) শুরুতে ফকনারের সম্পর্কে এম টমাস ইঙ্গের একটা মন্তব্য দিয়েছেন— ‘ফকনার এমনভাবেই লিখেছেন যেন ইংরেজিতে সাহিত্য বলতে কিছুই লেখা হয়নি, তিনি লিখতে শুরু করার আগে শ’খানিক বছর ধরে এতে যেন সাহিত্যের কোনো চল বা প্রথা-ঐতিহ্য বলেও কিছু ছিল না। তিনি কথাসাহিত্যকে নতুন গড়ন-গঠন দিয়েছেন। দারুণ শক্তিমত্তার সঙ্গে তার ভাষার অপ্রচলিত এবং অপ্রতিরোধ্য স্রোত— আধুনিক মানুষের করুণ ও কৌতুকময় গল্পগুলিকে এমনভাবে বলেছে, যাতে সময়, পরিসর এবং অভিজ্ঞতার দারুণ সব ভাঙচুর ঘটেছে। যেভাবে ফকনার লিখতে পারতেন, তেমনটাই তিনি লিখেছেন, এতে তার আগেকার জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ, যোসেফ কনরাড বা অন্যদের থাকা বা না-থাকায় কিছুই আসত-যেত না।’
ফকনার সম্পর্কে এমন কথা একদিকে যেমন চমকে দেয়, অন্যদিকে তেমন তার প্রবণতার মোক্ষম দিকটিও দেখিয়ে দেয়।




