জাতীয় গণগ্রন্থাগার
নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে দুর্লভ বই
- নতুন ভবন নির্মাণ: মেয়াদ বাড়বে আরও দুই বছর?
- প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নাকি হ্রাস?
- কী থাকবে নতুন ভবনে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম নিয়মিত শাহবাগ দিয়ে যাতায়াত করেন। তার প্রশ্ন, ‘ভার্সিটি যাওয়ার সময় দেখি, এখানে অনেক দিন ধরেই কাজ চলছে। এই কাজ শেষ কবে হবে?’ রাজধানীর শাহবাগে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে পাঁচ বছর ধরে। বাইরে থেকে নির্মাণকাজের ব্যস্ততা বোঝা গেলেও শাহবাগে কবে আবার পাঠকের জন্য খুলবে প্রিয় পাঠাগারের দরজা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। মাইনুলের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্মাণকাজে যুক্তদের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তাতে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় আবারও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়ও। যদিও একনেক থেকে প্রকল্পটির ব্যয় হ্রাস করার কথা বলা হয়েছে। এদিকে অস্থায়ী জায়গায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালাতে গিয়ে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ভাড়া। তার চেয়েও বড় উদ্বেগ, বিপুলসংখ্যক বইয়ের একটি অংশ দীর্ঘদিন বাক্সবন্দি হয়ে রয়েছে। এতে অনেক দুর্লভ বই ও নথি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০২১ সালের জুনে। প্রথম বছর চলে শুধু ভবন ভাঙার কাজ। ২০২২ সালে শুরু হয় নতুন ভবনের নির্মাণ। গ্রন্থাগারটির সব বই স্থানান্তর করা হয় অস্থায়ী পাঠাগারে। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) ভবনের দুটি ফ্লোরে রয়েছে অস্থায়ী পাঠাগার। আর জাতীয় গণগ্রন্থাগারের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশে বিএসএল ভবনে। স্থানান্তরের কারণে সংগ্রহে থাকা প্রায় আড়াই লাখ বইয়ের মধ্যে শুধু এক-তৃতীয়াংশ বই অস্থায়ী পাঠাগারের শেলফে রাখা সম্ভব হয়েছে। বাকি বই রয়েছে বাক্সবন্দি। যে ধরনের তাপমাত্রায় বই সংরক্ষণ করতে হয়, সেটি বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় উপযুক্ত পরিবেশের বাইরে থাকলে কাগজ, বাঁধাই ও মুদ্রণের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অস্থায়ী ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও তা সবসময় নির্বিঘ্নে কাজ করে না। এ বিষয়ে গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছেন, যেসব মূল্যবান বই বা সামগ্রী নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা তারা নিয়েছেন। কিছু বই স্ক্যান করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দুষ্প্রাপ্য বই সংরক্ষণের যে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের সহযোগিতায় কিছু দুর্লভ বই সেখানে সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে চেষ্টা চলছে।
কী পরিমাণ বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে— জানতে চাইলে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘স্থানান্তরের কারণে কিছু বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তবে কী পরিমাণ, তা এখন বলা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি বইগুলো সুরক্ষিত রাখতে। যেসব মূল্যবান বই বা সামগ্রী নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু বই স্ক্যান করে রাখা হয়েছে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাহবাগের সেই লাল সিঁড়ির পাবলিক লাইব্রেরির জায়গায় এরই মধ্যে বহুতল ভবনের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজের তদারকি করছেন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. রফিকুজ্জামান। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এরই মধ্যে ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলা যায়।’ তবে প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। প্রকল্পটির বর্তমান অনুমোদিত ব্যয় ৫৬১ কোটি টাকা। ব্যয় বাড়িয়ে ৬২০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হলেও পরে তা যৌক্তিকভাবে কমিয়ে প্রায় ৫৮৮ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেছেন, ‘চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ খতিয়ে দেখতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সিদ্ধান্তের পর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মাধ্যমে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় থেকে কমিয়ে বর্তমানে ৫৮৮ কোটি টাকা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন হয়ে তা আবার একনেকে পাঠাবে। প্রকল্পটির কাজ ২০২৮ সালের জুনে সম্পূর্ণভাবে শেষ করার কথা প্রস্তাবে বলা হয়েছে।’
শুধু বইয়ের সংরক্ষণ নয়, অস্থায়ী ঠিকানায় পাঠকের সংখ্যাতেও প্রভাব পড়েছে। করোনার আগে জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ পাঠক আসতেন। অস্থায়ী ভবনে কার্যক্রম শুরুর পর প্রতিদিন গড়ে একশর কম পাঠক আসছেন বলে গণগ্রন্থাগারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, বসার জায়গা কমে যাওয়া, সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য অংশ বাক্সবন্দি থাকা এবং বর্তমান অবস্থান পাঠকদের জন্য তুলনামূলক কম সুবিধাজনক হওয়া। অস্থায়ী পাঠাগারে গিয়ে দেখা যায়, অল্প কয়েকজন পাঠক উপস্থিত। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শুধু পাঠকসেবাই নয়, দেশের ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য প্রতি বছর কেনা প্রায় ২ কোটি টাকার বইয়ের ক্যাটালগিং, শ্রেণিবিন্যাস ও বাছাইয়ের কাজও গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের আওতায় চলে। জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও কার্যক্রমও পরিচালিত হয় এখান থেকে। ফলে দাপ্তরিক কাজও প্রতিষ্ঠানটি ঠিকমতো পরিচালনা করতে গিয়ে সংকটে রয়েছে। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বলছে, নতুন ভবন চালু হলে পাঠকরা একই জায়গায় সাধারণ পাঠাগার, বিজ্ঞান পাঠাগার, রেফারেন্স পাঠকক্ষ, শিশু-কিশোর শাখা ও অনলাইন পাঠাগারসহ নানা সুবিধা পাবেন। থাকবে মিলনায়তনও। ভবনটির বেজমেন্টে রাখা হয়েছে গাড়ি পার্কিং ও মিলনায়তন। গ্রাউন্ডফ্লোর থেকে নবমতলা পর্যন্ত অফিস, ক্যাফেটেরিয়া, পাঠাগার, ই-লাইব্রেরি, জিমনেশিয়াম, শিশুদের কর্নার, প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে। এসব সুবিধার অবকাঠামো এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। গণগ্রন্থাগারের পাশেই আরেকটি পৃথক ১০ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে, যেটি ব্যবহার হবে আবাসন হিসেবে। সব মিলিয়ে অত্যাধুনিক ভবনে গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম ২০২৮ সালের জুন মাস নাগাদ ফিরবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নতুন ভবন চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী ঠিকানায় সীমিত পাঠকসেবা এবং বাক্সবন্দি বইয়ের সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দীর্ঘদিন উপযুক্ত পরিবেশের বাইরে থাকা দুর্লভ বই ও নথিগুলো শেষ পর্যন্ত কী অবস্থায় নতুন ভবনে ফিরবে, সেটিও এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে শাহবাগের লাল সিঁড়ির সেই পুরনো ভবনটিও হয়তো বইপ্রেমীদের স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে।




