সত্য, ক্ষমতা ও মিশেল ফুকো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মিশেল ফুকোর জন্মের একশ বছর পূর্তি আমাদের শুধু একজন দার্শনিককে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; বরং এমন এক চিন্তাবিদকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ, যিনি আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র, জ্ঞান, সত্য, ক্ষমতা এবং মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আমূল নাড়া দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে যতজন চিন্তাবিদ গভীর প্রভাব ফেলেছেন, ফুকো তাদের অন্যতম। তার রচনাগুলো আজও যেমন আলোচনার কেন্দ্রে, তেমনি সমালোচনারও।
১৯২৬ সালে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া পল-মিশেল ফুকো একটি সচ্ছল চিকিৎসক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল তিনিও চিকিৎসক হবেন, কিন্তু তিনি বেছে নেন দর্শনের পথ। প্যারিসের মর্যাদাপূর্ণ Ecole Normale Superieure-এ পড়াশোনার সময় তিনি দর্শনের পাশাপাশি মনোবিজ্ঞানেও গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিষণ্নতা, আত্মহত্যার চেষ্টা এবং নিজের সমকামী পরিচয় নিয়ে সংগ্রাম তার চিন্তার জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা, গবেষণা এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ বৌদ্ধিক জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক চিন্তাবিদে পরিণত হন, যিনি কোনো একক বৌদ্ধিক ধারার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি।
ফুকোর বৌদ্ধিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন— সত্য কীভাবে তৈরি হয়? তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য কোনো চিরন্তন বা নিরপেক্ষ বাস্তবতা নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানব্যবস্থা এবং ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তা গড়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, আইন কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা যখন কাউকে ‘স্বাভাবিক’, ‘অস্বাভাবিক’, ‘সুস্থ’ বা ‘অসুস্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তারা শুধু তথ্য দিচ্ছে না; বরং একটি বিশেষ ধরনের সত্য প্রতিষ্ঠা করছে। এ কারণেই ফুকো আমাদের শিখিয়েছেন, যে সত্যকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি, তার উৎপত্তি কোথায় এবং কীভাবে তা বৈধতা পেয়েছে— সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষমতা সম্পর্কে তার ধারণা সমাজবিজ্ঞানে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। প্রচলিত ধারণায় ক্ষমতা রাষ্ট্র, সরকার কিংবা শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। কিন্তু ফুকোর মতে, ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা সম্পর্কের এক জটিল জাল। পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারাগার, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়েও ক্ষমতা কাজ করে। তাই ক্ষমতাকে বোঝার জন্য শুধু কে ক্ষমতাবান তা জানাই যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হবে ক্ষমতা কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর হচ্ছে। তার বিখ্যাত উক্তি— যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই প্রতিরোধও আছে— ক্ষমতার এ গতিশীল চরিত্রেরই ইঙ্গিত দেয়।
এ ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফুকো জেরেমি বেনথামের ‘প্যানঅপটিকন’-এর ধারণাকে নতুন অর্থে ব্যবহার করেন। কেন্দ্রে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং চারদিকে বন্দিদের কক্ষ— এমন এক কারাগারের নকশা, যেখানে বন্দিরা জানে না কখন তাদের দেখা হচ্ছে। ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। ফুকোর মতে, আধুনিক সমাজের বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারখানা, সামরিক বাহিনী কিংবা অফিসও একই নীতিতে পরিচালিত হয়। মানুষ সবসময় নজরদারির সম্ভাবনার মধ্যে বাস করতে করতে একসময় নিজেই নিজের আচরণের প্রহরী হয়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় ‘অনুগত দেহ’— যে দেহ সামাজিক নিয়ম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানিয়ে নিতে শেখে।
ফুকোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘বায়োপাওয়ার’। তার মতে, আধুনিক রাষ্ট্র শুধু আইন বা শাস্তির মাধ্যমে নয়; মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, জন্ম, মৃত্যু, যৌনতা এবং জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও ক্ষমতা প্রয়োগ করে। জনস্বাস্থ্য, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পরিসংখ্যান কিংবা চিকিৎসাব্যবস্থা— সবই এ বায়োপাওয়ারের অংশ। শিল্পায়ন ও পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দেহ ও জীবনের ওপর এই নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে মানুষের জৈবিক অস্তিত্বও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।
মানবদেহ ও যৌনতা নিয়ে ফুকোর বিশ্লেষণ তাকে সমকালীন চিন্তার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, যৌন পরিচয় শুধু জৈবিক বাস্তবতা নয়; বরং সামাজিক ভাষ্য ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মিত একটি ধারণা। সমাজই নির্ধারণ করে কোন যৌন আচরণ স্বাভাবিক, কোনটি অস্বাভাবিক, কোন পরিচয় গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়। একজন সমকামী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাও তার এ বিশ্লেষণকে গভীরতা দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয় কোনো স্থির সত্তা নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তা ক্রমাগত গঠিত হয়।
ফুকোর ‘ডিসকোর্স’ বা সামাজিক ভাষ্যের ধারণাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, সমাজে আমরা যেভাবে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি, অথবা কোনো বিষয়কে নীরবতার আড়ালে রাখি, তার মধ্যেও ক্ষমতার কার্যকারিতা নিহিত থাকে। কে অপরাধী, কে সুস্থ, কে নৈতিক, কে বিচ্যুত— এসব নির্ধারণের পেছনে সামাজিক ভাষ্যই কাজ করে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিও তার কাছে ক্ষমতার একটি কৌশল, কারণ এর মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সামাজিক শ্রেণিবিভাগের মধ্যে স্থান দেয় এবং নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসে।
তার বিখ্যাত গ্রন্থ Discipline and Punish আধুনিক কারাগার ব্যবস্থার এক মৌলিক বিশ্লেষণ। ফুকোর মতে, কারাগারের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে বিচ্ছিন্ন রাখা নয়; বরং তাকে নিয়ম, সময় ও শৃঙ্খলার মধ্যে অভ্যস্ত করে তোলা। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম, খাবার, কাজ কিংবা সাক্ষাৎ— সবকিছুই এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় যে, বন্দি ধীরে ধীরে নিয়ম মেনে চলাকে নিজের স্বভাব হিসেবে গ্রহণ করে। এ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কারাগার আসলে আধুনিক সমাজের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি প্রতীক।
তবে ফুকোর চিন্তা সর্বজনস্বীকৃত নয়। জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাসের মতে, ফুকো ক্ষমতার সর্বব্যাপী উপস্থিতি দেখালেও কোন ক্ষমতা ন্যায়সংগত আর কোনটি অন্যায়— তার কোনো নৈতিক মানদণ্ড দেননি। অন্যদিকে নারীবাদী চিন্তাবিদ ন্যান্সি হার্টসক ও ন্যান্সি ফ্রেজার মনে করেন, ফুকোর তত্ত্ব নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং মুক্তির রাজনৈতিক সংগ্রামকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। তাদের মতে, ক্ষমতাকে সর্বত্র বিদ্যমান ও সম্পর্কনির্ভর হিসেবে দেখার ফলে সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়। আবার রজার কিমবলের মতো সমালোচকরা তার ব্যক্তিগত জীবন, ভাষার দুর্বোধ্যতা এবং যৌনতা-সংক্রান্ত কিছু বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এসব
বিতর্ক সত্ত্বেও ফুকোর গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। বরং তার চিন্তা
আজও নতুন নতুন গবেষণা,
পুনর্ব্যাখ্যা ও বিতর্কের জন্ম
দিচ্ছে। কারণ তিনি আমাদের
শিখিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো
জ্ঞান বা কোনো সত্যকেই
প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়।
সমাজ যেসব ধারণাকে স্বাভাবিক,
নিরপেক্ষ বা চিরন্তন বলে
প্রতিষ্ঠা করে, সেগুলোর পেছনেও
ইতিহাস, ভাষা, ক্ষমতা এবং সামাজিক প্রক্রিয়ার
দীর্ঘ নির্মাণকাজ সক্রিয় থাকে।
জন্মশতবর্ষে মিশেল ফুকোকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড়
কারণ সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের কোনো
চূড়ান্ত উত্তর দিয়ে যাননি; বরং নতুন প্রশ্ন
করার সাহস দিয়েছেন। সেই
প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তার চিন্তার স্থায়িত্ব।
আধুনিক সমাজকে বোঝার জন্য, ক্ষমতার অদৃশ্য কার্যকারিতা শনাক্ত করার জন্য এবং
সত্যের দাবিকে নতুন করে যাচাই
করার জন্য ফুকো আজও
অপরিহার্য। তাই একশ বছর
পরেও তিনি শুধু অতীতের
একজন দার্শনিক নন; বরং বর্তমান
ও ভবিষ্যতের বৌদ্ধিক আলোচনারও এক অনিবার্য সহযাত্রী।




